১৫ আগস্টেই কেন স্বাধীনতা? জানুন রহস্যময় তারিখের নেপথ্য কাহিনী

|

রানার প্রতিবেদন : দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শেষ। ১৯৪৬ সালে পালা বদল হলো ব্রিটেনে। ক্ষমতায় এলো লেবার পার্টি। প্রধানমন্ত্রী হলেন ক্লিমেন্ট এটলি। ক্ষমতায় বসেই বুঝতে পারলেন, ভারতকে আর পদানত করে রাখা যাবে না। একদিকে ভারতে তুমুল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, যা রীতিমতো ব্যাপক গন আন্দোলনের চেহারা নিয়েছে অন্যদিকে প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের পর ব্রিটেনের ওপর চাপ বাড়তে শুরু করলো, উপনিবেশিক দেশগুলিকে মুক্ত করার জন্য। এটলির নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ মন্ত্রিসভা নীতিগতভাবে সিধান্ত নিল, তারা ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসন প্রত্যাহার করে নেবে। কবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে, সেই সিধান্ত গ্রহণের ভার থাকলো প্রধানমন্ত্রীর হাতেই। এটলি ঠিক করলেন ১৯৪৮ সালের জুন মাসে নাগাদ ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেয়ায় হবে।

এরপরই ভারত জড়িয়ে পড়লো ব্যাপক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে। মহম্মদ আলি জিন্নার নেতৃত্বধীন মুসলিম লিগ দাবি করলো, ভারতকে টুকরো করে মুসলিমদের জন্য আলাদা দেশ দিতে হবে। শুরু হলো দাঙ্গা, ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক এক কালো অধ্যায়। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাকে হিন্দু মুক্ত করে সেই এলাকা স্বাধীন মুসলিম দেশে অন্তর্ভুক্ত করতে লিগ নেমে পড়লো হিন্দু নিধনে।

অবিভক্ত বাংলা, পাঞ্জাব এবং বিহারের মাটি ভেসে গেল রক্তে। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হলো।ঘর-বাড়ি ফেলে পালাতে হলো লক্ষ লক্ষ মানুষকে। এমনকি জিন্না গো ধরে বসলো, তার প্রস্তাবিত পাকিস্তানে কলকাতাকে চাই। তিনি এমনও বলেছিলেন, কলকাতা ছাড়া পাকিস্তান নেবার কোনও মানেই হয় না। কিন্তু কলকাতায় হিন্দুদের সংখ্যা ছিল বেশি।

এই কারনে জিন্নার দাবি ধোপে টিকবে না বুঝতে পেরে লিগ সিধান্ত নিল, হিন্দুদের মেরে তাড়িয়ে কলকাতাকে মুসলিম সংখ্যাধিক্য শহর বানাতে হবে। জিন্নার দলের নেতা সুরাবর্দী সেই সিধান্ত কার্যকর করতে ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ডাক দিলেন হিন্দু নিধনের। যা পরবর্তীতে কুখ্যাত কলকাতা নিধনযজ্ঞ নামে পরিচিত। ইংরেজিতে বলা হয় গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং।

১৬ আগস্ট থেকে শুরু হয়ে গেল তান্ডব। দুদিন ধরে একতরফা খুন-জখম-ধর্ষণ-আগুন চলার পর তৃতীয় দিন থেকে শুরু হয় পাল্টা প্রতিরোধ। নেতৃত্ব দেন গোপাল পাঠা। দাঙ্গাকারীরা পিছু হটতে শুরু করে, পরে রণে ভঙ্গ দেয়। ব্রিটিশরা কংগ্রেসের আপত্তি সত্বেও মুসলিম লিগের দাবি মেনে ভারত ভাগে সম্মত হয়। শুরু হয় দেশ ভাগের তৎপরতা। সীমানা নির্ধারণের প্রক্রিয়া।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং দাঙ্গা পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যে, দেশের অন্তর্বর্তী সরকার ভেঙে যাবার উপক্রম হয়। অন্যদিকে লাশের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। সেই সময় ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেন বাধ্য হয়ে এটলিকে পরামর্শ দেন, ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন এগিয়ে আনার জন্য। এটলি এবং মাউন্টব্যাটেন পরামর্শ করে ঠিক করেন এক বছর আগে ৪৭ সালেই ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেয়ায় হবে।

কিন্তু তারিখ? মাউন্টব্যাটেন প্রস্তাব দিলেন, দিনটা ১৫ আগস্ট করা হোক। কারন ব্যাখ্যা করে মাউন্টব্যাটেন বললেন, এই দিনটি ব্রিটেনের জন্য ঐতিহাসিক দিন। পৃথিবীর শুভ শক্তির বিজয়ের দিন। ১৯৪৫ সালের ওই দিনই মিত্র শক্তির কাছে আত্মসমর্পনের কথা ঘোষণা করেছিলেন জাপানের সম্রাট হিরোহিতো। এটলি সম্মত হলেন।

১৯৪৭ এর ১৪ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ভাগ হলো ভারত এবং পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হলেন মহম্মদ আলি জিন্না। প্রধানমন্ত্রী হলেন লিয়াকত আলি। জিন্না শপথ নিলেন ব্রিটেনের রাজা জর্জ ৬ এর প্রতিনিধি হিসেবে এবং শপথ নিলেন জর্জের নামেই। জিন্নার হাতে দেওয়া হলো পাকিস্তান শাসনের সর্বোচ্চ ক্ষমতা। জিন্নাকে শপথ বাক্য পাঠ করলেন স্থানীয় ফেডারেল কোর্টের প্রধান বিচারপতি।

পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল সেই যে সর্বোচ্চ ক্ষমতা পেলেন, তা নিয়ে জন্মলগ্ন থেকেই শুরু হলো দ্বন্দ্ব। মানুষের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তেমন গুরুত্বই পেলেন না। স্বাধীনতার পর থেকে টানা ছয়জন প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত হতে হয়েছে গভর্নর জেনারেলের হাতে। ১৯৪৭ এর ১৪ই আগস্ট দিল্লির সংসদের সেন্ট্রাল হলে রাত এগারোটায় বসলো বিশেষ অধিবেশন।

স্বাধীন ভারতের প্রথম মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম গভর্নর জেনারেল মাউন্টব্যাটেনের হাতে তুলে দিলেন জহরলাল নেহরু। ঘড়ির কাঁটা ঠিক রাত বারোটার ঘর অতিক্রম করতেই শুরু হলো শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। মাউন্টব্যাটেন শপথ বাক্য পাঠ করালেন নেহরুকে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তিনি। পাকিস্তানের মতো গভর্নর জেনারেল কেন্দ্রিক সরকার হলো না ভারতে।

এখানে প্রধানমন্ত্রী কেন্দ্রিক সরকার হলো। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশ রাজার নামে শপথ নিলেন না। তিনি দেশের আইন ও সংবিধানের নামে শপথ নিলেন। যদিও ভারতের নিজস্ব কোনও সংবিধান ছিল না সেইসময়। পরে আম্বেদকরের নেতৃত্বে সংবিধান কমিটি তৈরি হয়। তারাই তৈরি করেন স্বাধীন দেশের সংবিধান এবং ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি সেই সংবিধানকে গ্রহন করে দেশ।

১৯৪৮ সালে গভর্নর জেনারেল পদ থেকে অব্যাহতি নেন মাউন্টব্যাটেন। তার জায়গায় ২১ জুন ১৯৪৮ সালে দায়িত্বে আসেন চক্রবর্তী রাজা গোপালচারী। ভারতের গভর্নর জেনারেলের পদ, যা পরিচিত ছিল ব্রিটিশ রাজের প্রতিনিধি হিসেবে সেই পদও অবলুপ্ত হলো ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি, সংবিধান গ্রহনেরর দিন। ওই দিন থেকে ভারতের সর্বোচ্চ নিয়মতান্ত্রিক প্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি। সেই গুরুত্বপূর্ন পদে প্রথম দায়িত্ব নিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তন ছাত্র এবং হিন্দু হোস্টেলের আবাসিক ড.রাজেন্দ্র প্রসাদ।

আরও পড়ুন