রানার প্রতিবেদন : মোদির নেতৃত্বে এনডিএ সরকার যখন দিল্লির ক্ষমতায় এলো, তখন আর্থিক বিচারে ভারত দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় বিনিয়োগের জায়গা। দ্রুত হারে সম্প্রসারিত বাজার অর্থনীতির অন্যতম ঠিকানা ভারত। প্রতিবেশী দেশগুলির ঈর্ষার কারন, চিনের মাথা ব্যাথার কারন। গত সাত বছর পর, এখন আর ভারতবর্ষকে বিনিয়োগের উপযোগী দেশ বলে মনেই করে না আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলো।
সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থা এই মর্মে বিজ্ঞপ্তি জারি করতেও পিছপা হয়নি। সাত বছর আগে আমাদের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার মতো। সেদেশের একজন নাগরিকের মাথাপিছু বাৎসরিক গর আয় ছিল ভারতের একজন নাগরিকের থেকে অর্ধেক। বাংলাদেশির তুলনায় একজন ভারতীয়র বাৎসরিক গর আয় ছিল দ্বিগুন।
এই মুহূর্তে ভারতের একজন নাগরিকের বাৎসরিক মাথা পিছু আয়, ১৯৪৭ মার্কিন ডলার( ভারতীয় টাকায় ১৪১৮৫২.৫৮ টাকা) অন্যদিকে বাংলাদেশের একজন নাগরিকের বাৎসরিক গর আয় ২২২৭ মার্কিন ডলার( ভারতীয় টাকায় ১৬২২৫১.৪৩ টাকা)। নরেন্দ্র মোদি যখন ক্ষমতায় এলেন সেই সময় ভারত ছিল বিশ্বের অন্যতম আর্থিক বিকাশশীল দেশ। জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৭.০৪ শতাংশ।
মোট জিডিপি ছিল ১৭৫২৭৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারতে কোভিড হানা দেবার আগেই মুখ থুবড়ে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। জিডিপি বৃদ্ধির হার নেমে যায় শূন্যের নিচে। ২০১৯-২০ আর্থিক বছরে মোট জিডিপি ছিল মাত্র ১৪৫.৭ লক্ষ কোটি টাকা। সেইসঙ্গে কমছে ব্যাংকে সুদের হার। বয়স্ক মানুষদের বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পের সুদের হার কমছে হুহু করে।
ব্যাপক হারে বিক্রি হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থা। সেই অর্থ জমা হচ্ছে সরকারি কোষাগারে। প্রশ্ন উঠছে সেই টাকা যাচ্ছে কোথায়। কেননা সকলকে অবাক করে দিয়ে বর্তমান সরকার International Development Association থেকে ঋণ নিয়েছে ৫৪৬৫ লক্ষ কোটি টাকা। ( সূত্র ইকোনমিক টাইমস)। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সাল ( কোভিদের আগে) পর্যন্ত ভারত বিশ্ব ব্যাংক থেকে ধার নিয়েছে ২১৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক থেকে ডিভিডেন্ট হিসাবে সরকার নিয়েছে ৯৯১২২ কোটি টাকা। মোদি সরকার ক্ষমতায় যখন এলো তখন একজন ভারতীয়র মাথার ওপর ঋণের বোঝা ছিল ৩৭৮০২ টাকা। এখন সেটা বেড়ে হয়েছে ৭৩৬৩৭ টাকা। অর্থাৎ গত সাত বছরে ঋণের বোঝা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আইএমএফ জানিয়েছে, এই মুহূর্তে মাথা পিছু আয়ের ক্ষেত্রে বিশ্বের ১৩৮ নম্বর জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে ভারত।
ভারতের সাধারণ মানুষের আর্থিক ক্ষমতা যখন কমছে তখন উল্টোদিকে হুহু করে বাড়ছে ধনীর ধন। আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফাম World Economic Forum: Davos Dialouge এ যে রিপোর্ট পেশ করেছে তাতে বলা হয়েছে, মহামারীরকালে ভারতের প্রথম সারির ১০০ জন ধনী ব্যক্তির মোট আয় বেড়েছে ১২৯৭৮২২ কোটি টাকা।
বলা হয়েছে মহামারিতে বিপর্যস্ত সাধারণ ভারতীয়দের মধ্যে ধনীরা যদি তাদের অতিরিক্ত লাভ বন্টন করে দিত, তাহলে এক এক জন ভারতীয় হাতে পেতেন ৯৪০৪৫ টাকা করে। শুধু তাই নয়, প্রথম ১০০ জন ধনী ব্যক্তির কাছ থেকে সরকার যদি ১ শতাংশ অতিরিক্ত কর নিত মহামারী মোকাবিলায় তাহলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা যেত।
শুধুমাত্র “জন আয়ুস” প্রকল্পের তহবিল বৃদ্ধি পেত ১৪০ গুন। ভারত হলো বিশ্বের এমন দেশ যেখানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সবচেয়ে অবহেলিত। বিশ্বের এমন চারটি দেশ আছে যারা স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম অর্থ খরচ করে, সেই চার দেশের অন্যতম দেশের নাম ভারতবর্ষ। গত কয়েক বছরে দেশে ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য হুহু করে বেড়েই চলেছে।
বছর কয়েক আগে মুকেশ আম্বানি এক ঘন্টায় যা রোজগার করতেন, সেটা রোজগার করতে হলে একজন সাধারন শ্রমিককে ব্যয় করতে হতো দশ হাজার বছর। বর্তমানে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। একজন সাধারন শ্রমিক দশ হাজার বছর যত টাকা রোজগার করতে পারবেন, মুকেশ আম্বানির এখন সেই পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে লাগবে এক সেকেন্ড।
ভারতের ধনীরা এখন বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলির সঙ্গে বসে আছে একাসনে। ভারতের প্রথম দশ জন ধনীর রোজগার এরকম:১) মুকেশ আম্বানি ৮৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ২) গৌতম আদানি ৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ৩) শিব নাদার ২৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ৪) রাধাকৃষ্ণন দামিনি ১৬.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ৫) উদয় কোটাক ১৫.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
৬) লক্ষী মিত্তাল ১৪.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ৭) কুমার বিরলা ১২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ৮) সাইরাম পুনাওয়ালা ১২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ৯) দিলীপ সাংভি ১০.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ১০) সুনীল মিত্তাল ১০.০৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একদিকে যখন টাকার পাহাড় তৈরি করছে ধনীরা অন্যদিকে মহামারীর ধাক্কায় তখন সংগঠিত ক্ষেত্রে চাকরি গেছে ১২ কোটি ২০ লক্ষ মানুষের।
আর অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মহীন হয়েছে প্রায় ৯২ কোটি মানুষ। গোটা বিশ্বের সাধরন মানুষের আর্থিক ক্ষমতার বিচারে দেশ এখন দাড়িয়ে আছে দুনিয়ার ১৩৮ তম স্থানে। উল্টো দিকে দেশের গুটিকয় ধনীর ধন বাড়তে বাড়তে তারা এখন পৌঁছে গেছে বিশ্বের ষষ্ঠ স্থানে। ভারতের ধনীদের ঘরে যা ধন আছে তার থেকে বেশি ধন আছে বিশ্বের মাত্র পাঁচটি দেশের ধনীদের কাছে।
এই দেশগুলো হলো আমেরিকা, চিন, জার্মানি, রাশিয়া এবং ফ্রান্স। দিন যত গড়াচ্ছে ধনী-গরিবের পার্থক্যও তত বাড়ছে হুহু করে। যেটা এখন ৬ আর ১৩৮ এ দাঁড়িয়ে। অর্থাৎ জগতের দুই মেরুতে অবস্থান দুই গোষ্ঠীর। একদিকে দেশের তিন শতাংশ ধনী দেশের ৯৭ শতাংশ ধন কব্জা করে বিশ্বের প্রথম সারিতে, অন্যদিকে ৯৭ শতাংশ হতভাগ্য মানুষ দাঁড়িয়ে বিশ্বের শেষ সারিতে।
