গৌরাঙ্গ চট্টোপাধ্যায়: এমন ভাব দেখান হচ্ছে যে দেউচা, পাঁচামি খোলামুখ কয়লা খনি প্রকল্প নিয়ে যেন রাজ্য সরকার হিমালয়প্রমান কাজ করছে।কিন্ত মনে রাখা দরকার বাম সময়কালে অন্ডালে কাজী নজরুল বিমানবন্দর ৩৫০০ একর, অন্ডাল ভিভিসি ১০০০ একর, পানাগড় শিল্পতালুক ৩৫০০একর এবং রাণীগঞ্জ, জামুরিয়া, এবং সালানপুর বারাবনি ব্লকে ৬০০০ একর অর্থাৎ শুধুমাত্র অবিভক্ত বর্ধমান জেলাতেই মোট ১৪০০০ একর এলাকাতেই বিরাট বিরাট শিল্প মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে পানাগড় শিল্পতালুকে অধিগৃহীত জমির ফাঁকা ১৫০০ একর জমিতে তৃণমুল সরকার একটা বিড়ি কারখানাও করতে পারল না। হ্যাঁ, তৃণমূলের ধ্বাংত্মক নীতির ফলে সিঙ্গুর হল না। কিন্ত এর বিরুদ্ধে লড়ে বর্ধমানের এই বিশাল শিল্পতালুক যেভাবে রাজ্য, জেলা, এবং দেশের উন্নয়নে ভুমিকা পালন করছে তা অভাবনীয়।
এবার আসা যাক, দেউচা, পাঁচামি কয়লা ব্লকের প্রস্তাবিত খোলামুখ কয়লা খনি প্রকল্পের কথাতে। এ এক ধ্বংসাত্মক নীতি রাজ্য সরকার নিতে চলেছে। এখানে যে কয়লা ব্লক থেকে কয়লা উৎপাদন হবে তার ফলে আগামী ৩০বছরের মধ্যে দুবরাজপুর থেকে সিউড়ি এবং ইলামবাজার এলাকার পরিবেশের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। এই বিশাল এলাকা আগামী দিনে মরুভূমিতে পরিণত হবে। খোলামুখ খনির ফলে জমির উর্বরতা ধ্বংস হবে। এখানের মাটিতে চাষ আবাদ হবে না। অনেকেই জানেন কিনা জানি না, ভুস্তরের একেবারে ওপরের যে মাটিতে গাছ পালা এবং চাষ আবাদ হয় সেই মাটির এক মিটার মাটি তৈরি হতে ন্যূনতম সময় লাগে ১০০০০ বছর। এখন খোলামুখ খনি করার সময় লক্ষ লক্ষ বছরের কয়েকশ মিটার নিচের মাটি ওপরে চলে আসবে। আর ওপরের আবাদযোগ্য মাটি নিচে চলে যাবে। বসুন্ধরা বন্ধ্যা হবে। হাজার হাজার মানুষ এলাকার বসতবাটি থেকে উচ্ছেদ হবে। ওরা কিছু টাকা দিয়ে ভাবছে এই কাজ করবে। হয়ত আমরা থাকব না, খোলামুখ কয়লা খনির কল্যাণে একসময় আসানসোল থেকে সিউড়ি পর্যন্ত শুধুই মাটির ঢিপি আর বড় বড় হ্রদ থাকবে। মানুষ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে কয়েক শত স্কোয়ার কিলোমিটার এলাকা।
তাহলে কি কয়লার দরকার নেই? অবশ্যই আছে। তারজন্য যে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, জমিকে পুনর্ব্যবহারের পরিকল্পনা, কয়লা তোলার পর ঐ জমিকে আবার ব্যবহারযোগ্য করে তোলার পরিকল্পনা, এসব নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী? তা সরকারকে জানাতে হবে। ভুমিহারা যাদের চাকরি হবে সে চাকরির ধরণ কী? সামাজিক কোনো সুরক্ষা থাকবে কিনা, বেতন কত? সব জানাতে হবে। পরিবেশ যেসব গাছপালা ধ্বংস হবে, সেসবের জন্য বনসৃজন কোথায় হবে — এবং এখন যে গাছগুলো আছে সেই ধরণের বনজ সম্পদ থাকবে কিনা তার জন্য কী পরিকল্পনা, তা জানাতে হবে।
খাল, বিল, ঝর্ণা, অজয় ও অন্যান্য ছোট বড় নদীগুলোর গতিপথের কী হবে? জীববৈচিত্র্য যা ধ্বংস হবে তা রক্ষার পরিকল্পনা কী তা জানাতে হবে? মন্দির, মসজিদ, গির্জা, হাসপাতাল— এ সবের কী হবে? এসব নানাবিধ বিষয় আছে।
মনে রাখতে হবে, এই খনির কল্যাণে আগামীতে বীরভুম এবং পশ্চিম বর্ধমানের নাগরিক সহ লক্ষ লক্ষ বছরে জীববৈচিত্র্যে প্রভুত ধ্বংসাত্মক পরিবর্তন আনবে এই লোভের প্রকল্প। এই এলাকা কোন বন্ধ্যা, ফাঁকা বাঞ্জর, ভুমি নয় যে, এখানে ইচ্ছে হলেই এই ধরনের প্রকল্প চালু করে দেওয়া যাবে।
এই প্রকল্প সফল করতে গেলে পরিবেশবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, বাস্তুতন্ত্রবিজ্ঞান, ভূতাত্বিক, চিকিৎসাবিজ্ঞানী, হাইড্রোলজিস্ট, সমাজবিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ, পরিবেশবিজ্ঞানী এবং মাক্রোবায়োলজিস্ট এই সবার মধ্যে সমন্বয় সাধন করেই এগোনো দরকার। যে কোন হঠকারী সিদ্ধান্ত কিন্তু আমাদের সবার পক্ষে মারাত্মক বিপদ ডেকে আনবে।(লেখক সিপিএম-এর প্রাক্তন বিধায়ক)
