একদিকে একটা মুখ, অন্যদিকে সেনা-রাষ্ট্রশক্তি, লড়াইকে কুর্নিশ গোটা দুনিয়ার

|

রানার ডেস্ক : আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত পরিবারে যেমন স্বল্প স্বাচ্ছন্দ্য আর উচ্চ মূল্যবোধের ঘেরাটোপ থাকে, এই সুন্দরী তরুণীর জীবনেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। বরং মূল্যবোধ আর সামাজিক দায়বদ্ধতার শেকরটা ছিল অনেক গভীরে। কারন বাবা হিসাবে এই মেয়ে যাকে পেয়েছিলেন সেই মহম্মদ ইসমাইল একজন আদর্শবান শিক্ষক এবং মানবাধিকার কর্মী। তাঁকেই সামনে রেখে বেড়ে ওঠা এই মেয়েই একদিন হয়ে উঠলেন প্রতিবাদের এক অনন্য প্রতীক।

নাম গুলালাই ইসমাইল। এক কথায় পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ঘুম কেড়ে নিয়েছেন তিনি। জন্ম ১৯৮৬ সালে। বেড়ে ওঠা খাইবার পাসতুনখোয়ায়। চোখ ধাঁধানো সুন্দরী গুলালাই ছোট থেকেই অত্যন্ত মেধাবী। বাবার কাছ থেকে পাওয়া মানবিক শিক্ষাই গুলাইলাকে সমাজ সচেতন করে তোলে কিশোর বয়সেই। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই জড়িয়ে পড়েন সমাজসেবা আর মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে।

চলতে থাকে মেধাবী গুলালাইয়ের পড়াশুনাও। ইসলামাবাদের কয়েদ-এ-আজম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে মাস্টার্স গুলাইলার বিশেষ আগ্রহ বায়ো-টেকনলজি নিয়েও। কিন্তু আর পাঁচজন সুন্দরীর মতো জীবনকে সহজ ছকে ঢালার কোনও বাসনা ছিল না তাঁর। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করতে করতেই লক্ষ করলেন সেনা বাহিনী কিভাবে মানুষের কন্ঠস্বর দমন করার নামে চূড়ান্ত অত্যাচার নামিয়ে এনেছে দেশের মেয়েদের ওপর।

ধীরে ধীরে মুখ খুলতে শুরু করলেন গুলালাই, শুরু হলো সংঘাত। মাথা নত করলেন না এই তরুণী, ঠিক করলেন বিশাল সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনে একাই লড়বেন। প্রাণ থাকতে প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে । শুরু হলো যুদ্ধ। “পাক সেনা বাহিনী যথেচ্ছভাবে নারী নির্যাতন এবং যৌন শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানে। ধর্ষন যেন জলভাত। জঙ্গি দমনের নাম করে পাক সেনা বাহিনীর কাজই হলো গায়ের জোরে নারীদেহ ভোগ করা।

তল্লাশি মানেই মহিলাদের ওপর যৌন নির্যাতন।” একনাগাড়ে কথাগুলি বললেন পাকিস্তানের মানবাধিকার কর্মী গুলালাই ইসমাইল। “এওয়ার গার্লস” (Aware Girls) নামে একটি মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। গুলালাই সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন সংবাদ সংস্থা এএফপি-কে। তিনি বলেন, এগুলো শুনতে কেমন অদ্ভুত মনে হয়, মনে হয় গল্প, কিন্তু পাকিস্তানে এটাই বাস্তব।

অসংখ্য মেয়ে আমাদের সংস্থায় এসে যে সব অভিযোগ করে, সেগুলো শুনলে ঘৃণা আর আতঙ্ক গ্রাস করে শুধু। পাক সেনার অত্যাচার নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলার পর থেকেই গুলালাইকে হেনস্থা করে চলছে সরকার। অসংখ্য মামলা দেওয়া হয়েছে তার নামে। কার্যত পাক সেনার হিটলিস্টে এখন তার নামটাই এক নম্বরে। বেশ কয়েকবার ছুতোয় নাতায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তবু দমেননি তিনি।

কিন্তু গুলালাই এখন বুঝতে পারছেন এবার হয়ত তাকে নিকেশ করে দেওয়া হতে পারে। একই আশঙ্কা তার পরিবারের। বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়েছেন গুলালাই। বর্তমানে আছেন আমেরিকায় নিজের বোনের কাছে। চেষ্টা করছেন আমেরিকায় রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার। গুলালাই এর সঙ্গে পাক সেনার দ্বন্দ্ব তুঙ্গে ওঠে গত বছর। পাক সেনার পাশবিকতার শিকার হয়েছিল ১০ বছরের এক কিশোরী।

সেই সময় প্রকাশ্যে পাক সেনার এই আচরণের বিরুদ্ধে মুখ খোলাই শুধু নয়, আন্তর্জাতিক দুনিয়াকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে ছিলেন পাক সেনার ভয়ঙ্কর মুখটা। সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর নেমে আসে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। মোট তিনবার তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন বিষয়টি নিয়ে গুলালাই বিশ্বের দরবারে সরব হওয়ায় তাকে একবার হাতের মুঠোয় পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে পাক সেনা।

কিন্তু বিশ্বের জাগ্রত বিবেক রক্ষা করতে চাইছে তাঁকে। গুলালাই একাধিকবার বিশ্ব মঞ্চে পুরস্কৃত হয়েছেন, কুর্নিশ করা হয়েছে তার নজিরবিহীন নিরলস লড়াইকে। তিনি এখন বিশ্ব মানবাধিকার সংগঠনের প্রথম সারিতে। কিন্তু হায়নার মতো ওঁৎ পেতে আছে পাক সেনা বাহিনী। যদিও নির্ভীক গুলালাই-এর মন্তব্য, “মৃত্যু মানেই সব শেষ হয়ে যাওয়া নয়। লড়াইটা থেকেই যায় । ব্যাটনটা যেন শুধু হাতবদল হয়। সেটা নিশ্চিত করে যাওয়াই আমার কাজ।”

আরও পড়ুন