নিন্দিত খলনায়ক থেকে বন্দিত নায়ক ছিলেন জেলে, ফিরেই জয় করেন বিশ্বকাপ

|

রানার ডেস্ক : চলে গেলেন বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তি ইতালিয়ান তারকা পাওলো রোসি। বৃহস্পতিবার রোসির মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর জার্মানির ১৯৯০ বিশ্বকাপজয়ী তারকা ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমান টুইটে লেখেন,‘প্রিয় পাবলিতো, আমরা তোমাকে সবসময় মনে রাখব।’ কদিন আগেই পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়েছেন কিংবদন্তি দিয়েগো মারাদোনাআলেহান্দ্রো সাবেয়া

তাঁদের সঙ্গী হলেন ইতালিয়ান কিংবদন্তি পাওলো। সর্বকালের সেরা ফরোয়ার্ডদের একজন বলে খ্যাত রোসি জেল থেকে ফিরেই হয়েছিলেন ইতালির ১৯৮২ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক, ৬৪ বছর বয়সে মারা গেলেন তিনি। মৃত্যুর আগে ইতালিয়ান টিভি চ্যানেল আরএআই স্পোর্টে ফুটবল বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত ছিলেন রোসি। রোসির স্ত্রী ফেদেরিকা কেপেলেতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে প্রয়াত স্বামীর সঙ্গে একটি ছবি দিয়ে ইতালিয়ান ভাষায় লিখেছেন, ‘বিদায় চিরতরে।’

রোসির মৃত্যুর কারণ জানা না গেলেও আরএআই জানায় ‘দুরারোগ্য রোগ’ কেড়ে নিয়েছে তাঁকে। বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি জুভেন্টাসের হয়ে দু’টি সিরি এ এবং একটি করে ইউরোপিয়ান কাপ, কোপা ইতালিয়া ও উয়েফা সুপার কাপ জয় করেন রসি। তবে ফুটবলে তিনি অমর হয়ে আছেন ১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপে অভাবনীয় পারফরম্যান্সের কারণে। স্পেন বিশ্বকাপে রোসির আসলে খেলারই কথা ছিল না।

কিন্ত কোচ এনজো বেয়ারজোত জোর করেই দলে রাখেন। ১৯৮০ সালে পেরুজিয়ায় থাকাকালীন সিরি এ-তে ১৩ গোল করেছিলেন রোসি। জড়িয়ে পড়েছিলেন ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে। এই অভিযোগে ১৯৮০ সালেই ৩ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি জেলও হয়েছিল রোসির। রোসি অবশ্য বরাবরই সেই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, অবিচারের শিকার হয়েছিলেন তিনি।

পুরো সময় জেলে কাটালে ৮২ বিশ্বকাপে খেলা হতো না রোসির। বেয়ারজোতের হস্তক্ষেপে শাস্তি এক বছর কমানো হলে স্পেন বিশ্বকাপে যাওয়ার সুযোগ মেলে তাঁর। বেয়ারজোত ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপেও ইতালির কোচ ছিলেন। বিরাশিতেও তাঁকে দেওয়া হয় দায়িত্ব। ইতালিয়ান মিডিয়ার তা পছন্দ হয়নি। পছন্দ না হওয়ার কারণ তিনি জুভেন্টাস কেন্দ্রিক দল গড়েছিলেন বিশ্বকাপের জন্য।

তার চেয়েও বড় কথা জেল থেকে মুক্ত করে রোসিকে বিশ্বকাপ দলে নেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। এতে খেপে যায় ইতালির মিডিয়া। জেল থেকে বেরিয়ে বিশ্বকাপ শুরুর আগে তিনটি ম্যাচ খেলেন রোসি। গ্রুপ লিগের প্রথম তিন ম্যাচে রোসি গোল না পাওয়ায় আরও ক্ষিপ্ত হয় ইতালির মিডিয়া। রেগেমেগে বেয়ারজোত ইতালিয় প্রেসই বয়কট করেন। বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই ড্র করেছিল ইতালি।

দুই গোল আর ৩ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় হয়ে ওঠে নকআউটে। তারপর মুখোমুখি হয় ব্রাজিলের। যারা ছিল হট ফেভারিট। সবাই ধরেই নিয়েছিল বিশ্বকাপ ব্রাজিলই জিতবে। তাদের সামনে পড়ে ইতালি। কিন্তু বার্সেলোনার সারি স্টেডিয়ামে ১৯৮২ সালের ৫ জুলাই জিকো-সক্রেটিস নয়, ইতিহাস লিখেছিলেন রোসি। তখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে একটিও গোল না পাওয়া ইতালিয়ান রোসি হ্যাটট্রিক করে অভিশাপমুক্ত হন, নিন্দিত খলনায়ক থেকে হয়ে ওঠেন বন্দিত নায়ক।

৩-২ হেরে বিশ্বকাপ থেকেই বিদায় নেয় ব্রাজিল। রোসি পরে বলেছিলেন, ‘ব্রাজিলের বিপক্ষে ওটাই আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় ম্যাচ।’ সবমিলিয়ে ইতালির হয়ে ৪৮ ম্যাচে ২০ গোল করেছেন রোসি।রোসিরই দুই গোলে সেমিফাইনালে পোল্যান্ডকে হারায় ইতালি। আর ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ইতালির ৩-১ ব্যবধানের জয়ে প্রথম গোল করেন সদ্য প্রয়াত পাওলো রোসিই।

জিতে নেন গোল্ডেন বুট ও বল। রোসির কৃতিত্বেই ১৯৩৮ বিশ্বকাপের পর ১৯৮২ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায় ইতালি। ওই বছর রোসি জিতে নেন ব্যালন ডি’অর এবং ওয়ার্ল্ড সকারের বর্ষসেরা ফুটবলারের সম্মানও। জাতীয় দলের জার্সিতে তিনি শেষ ম্যাচ খেলেন ১৯৮৬ সালে। ক্লাব ফুটবল ক্যারিয়ারের পুরোটাই কাটিয়েছেন ইতালিতে। জুভেন্টাসের হয়ে শিরোপা জিতলেও তার সেরা গোল স্কোরিং ফর্স দেখা গেছে ভিসেনজায়।

ক্লাব ফুটবলে প্রয়াত এই স্ট্রাইকার সবচেয়ে বেশি খেলেছেন ভিসেনজার হয়ে। সিরিআর দল জুভেন্টাস আর এসি মিলানের হয়েও মাঠ মাতিয়েছেন রোসি। ক্লাবে ২৫১ ম্যাচে করেছেন ১০৩ গোল, জাতীয় দলে ৪৮ ম্যাচে ২০টি। আশির দশকে অবসরে যাওয়ার পর ফুটবল পণ্ডিত হিসেবে কাজ করেছেন স্কাই, মিডিয়াসেট এবং রাইয়ের মতো টিভি চ্যানেলে।

আরও পড়ুন