রানার প্রতিবেদন : সন্দেহ নেই ভারতীয় সংগীতজগতে এ আর রহমান প্রতিভা, দক্ষতা, শিষ্টাচার এবং ন্ম্রতার এক মূর্ত প্রতীক। ভারতীয় সংগীতে তিনি অর্জন করেছেন অনেক মাইলফলক এবং সাফল্যের সঙ্গে এক বিশ্ব আইকনে পরিণত হয়েছেন। তবে এখনও তাঁর বহুকথিত ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার বিষয়ে সকলেই খুব ঔৎসুক্য দেখান। এ আর রহমান যে হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তা কোনও গোপন বিষয় নয়।
বাবা মারা যাওয়ার পরে যখন তাঁরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন তখন তাঁর পুরো পরিবারের সাথে তাঁরও হৃদয় পরিবর্তন হয়েছিল। তাঁর মা একজন আধ্যাত্মিক মহিলা এবং স্বামীর অসুস্থতার সময় তাঁর আরোগ্যকামনায় বহু মন্দির, মসজিদ এবং গির্জায় তিনি ঘুরেছিলেন। সন্তপুরুষদের সাথে পরামর্শ করেছিলেন এবং ধর্মীয় নানা আচারের মাধ্যমে স্বামীর রোগ প্রতিকারের চেষ্টা করেছিলেন।
এই সময়েই তিনি একজন সুফি প্রচারকের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন, যিনি তাঁর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যান। ১৯৬৭ সালের ৬ জানুয়ারি আজকের এ আর রহমান জন্মেছিলেন এ এস দিলীপকুমার নামে। বাবা ছিলেন তামিল সংগীত পরিচালক আর কে শেখর এবং মা কস্তুরী দেবী। শেখর মোটামুটি নামী পরিচালকই ছিলেন। ১৯৭৬ সালে মাত্র নয় বছর বয়সে রহমান বাবাকে হারান, তাই বাবার কাছ থেকে সংগীত শিক্ষা নেওয়ার খুব বেশি সুযোগ তিনি পাননি।
মাকে কেন্দ্র করেই বড় হয়ে উঠেছেন রহমান। মাত্র ১১ বছর বয়সে বিভিন্ন অর্কেস্ট্রা গ্রুপের সাথে কি-বোর্ড বাজাতে শুরু করেন রহমান, স্রেফ পেট চালানোর জন্য। এভাবেই তাঁর মনে বাসা বাঁধতে শুরু করে সুরের মায়াজাল। তখনই অনেকে তাঁকে চিনতেন। তাঁর কাজ ছিল, নানান ফিল্মি গান কি-বোর্ডে বাজানো। ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত অনেক কিছু করেছেন তিনি। ‘রুটস’ নামে একটা ব্যান্ডে বন্ধু শিবমণি, জোজো, জন অ্যান্থনি এবং বাজাকে নিয়ে অনুষ্ঠান করতেন।
তামিল সংগীত পরিচালক ইলাইয়া রাজার দলে কি-বোর্ড প্লেয়ার হিসেবেও কাজ করতেন। বিজ্ঞাপনের জিঙ্গলসে সুর দিতেন। তথ্যচিত্রে সুরও দিয়েছেন। ইসলামের প্রতি সুগভীর ভালোবাসা সম্পর্কে তাঁর চিন্তাভাবনা প্রকাশ করে রহমান বলেছিলেন, ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়াটা বড় কথা নয়, আসলে আধ্যাত্মিক শিক্ষক, সুফি শিক্ষকরা তাঁকে এবং তাঁর মাকে এমন কিছু জিনিস শিখিয়েছিলেন যা খুবই বিশেষ। প্রতিটি ধর্মবিশ্বাসের মধ্যেই অনেক বিশেষ মঙ্গলকর বিষয় রয়েছে এবং তাঁরা ইসলামকে বেছে নিয়েছেন, বা বলা যায় তাঁর ছাতার তলায় এসে দাঁড়িয়েছেন।
রহমান এই সঙ্গে যোগ করেন, ‘সব ধর্মেই প্রার্থনা অত্যন্ত উপকারী একটি বিষয়। এই প্রার্থনা আমাকে অনেক পতন থেকে রক্ষা করেছে। প্রার্থনা করতে গিয়ে আমি মনে মনে ভাবি, ‘ওহ, আমাকে তো প্রার্থনা করতে হয়, তাই আমি কোনও খারাপ কাজ করতে পারি না’। অন্যান্য ধর্মের লোকেরাও একইভাবে এই প্রার্থনা করে এবং তা শান্তিপূর্ণ একটি বিষয়।’ এমনকি তাঁর কাছে কোনো গানের কথাও যেন প্রার্থনার সমান। সেই কথায় সুর বসিয়ে তিনি সেই প্রার্থনাকে আরো জোরদার করে তোলেন তিনি।
রহমানের বয়স যখন একুশ তখন তাঁর এক বোনের গুরুতর অসুখ হয়। কোনো চিকিৎসাতেই কোনোরকম কাজ হচ্ছিল না। সবাই যখন হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন তখন পরিবারের এক বন্ধুর উপদেশে তাঁরা যান শেখ আবদুল কাদের জিলানি নামে মুসলিম পিরের কাছে। পির কাদরি নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন তিনি। শেখরের রোগের সময়ও ওই একই সুফি প্রচারকের কাছে গিয়েছিলেন তাঁরা।
কিন্তু অন্তিম সময় বলে তিনি শেখরের জন্য কিছু করতে পারেননি। বোনের অসুখের সময় তাই দেরি করেননি। পির কাদরির দোয়ায় নাকি আশ্চর্যজনকভাবে রহমানের বোন দ্রুত সেরে ওঠেন। এই সুফি সাধকের সদুপদেশ ও সাহায্য গভীরভাবে প্রভাবিত করে তাঁদের ধর্মান্তরিত হতে। দিলীপকুমার হয়ে যান আজকের আবদুল রহমান।মা কস্তূরীর নাম হয় করিমা বেগম।
কিছুদিন পরে প্রখ্যাত সুরকার নওশাদ আলির সংস্পর্শে আসেন রহমান। নওশাদই উপদেশ দেন আবদুলটা বদলে ফেলে বিখ্যাত তবলাবাদক আল্লা রাখার নামে এ আর রাখতে। এভাবেই এ এস দিলীপকুমার থেকে আবদুল হয়ে আল্লা রাখা রহমান হন আজকের এ আর রহমান।
