জনগনের জন্য খুলে গেল রডন স্কয়ার, প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য চমকের পর চমক

|

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা : আগাছার জঞ্জাল পরিষ্কার করে নতুন রূপে রডন স্কোয়ার। বহু ভিন্ন ধরনের ফলের গাছ, ফুল এবং পাতাবাহার গাছের সাজানো হয়েছে উদ্যান। পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তৈরি পার্ক স্ট্রিটের বুকে এই নেচার পার্ক। চার দশক পর এ যেন এক আন্দোলনের জয়। প্রায় ১০-১২ বিঘা জমির উপর এই জায়গাটি দীর্ঘদিন ধরেই জঙ্গল হয়ে পড়েছিল।

ভেতরের দুটি পুকুরে জমে গিয়েছিল আবর্জনা। এই সঙ্গে আগাছার জঙ্গল, উঁচু মাটির ঢিপি। পোকামাকড়, সাপের উপদ্রব। পুকুরের জমা জলে ডেঙ্গু লার্ভার উপস্থিতি। সব মিলিয়ে বিচ্ছিরি অবস্থা। স্থানীয়দের অভিযোগও আসছিল। তারপর সেখানকার অবস্থা দেখতে খোদ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন কলকাতা পুরসভার মুখ্য প্রশাসক ফিরহাদ হাকিম এবং উদ্যান বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত তথা প্রশাসক বোর্ডের সদস্য দেবাশিস কুমার।

তারপরেই সংস্কারের কাজ শুরু হয়। তারপর সম্প্রতি দেড় কোটি টাকা খরচ করে নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে। এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে পেছনে। সালটা ১৯৮০, রডন স্কোয়ারে একটি মার্কেট কমপ্লেক্স তৈরি করতে চেয়েছিল তৎকালীন জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার। সেইসঙ্গে একটি সাংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র।

কিন্তু পরিবেশ ধ্বংস করে সেই কাজে বিতর্ক তৈরি হয়। রাস্তায় নামবেন তৎকালীন যুব কংগ্রেসের এক নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চলতে থাকে আইনি যুদ্ধ। তারপর সাংসদ হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বেশি করে বিষয়টি নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেন। তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি মমতার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। আদালতে মামলা উঠলে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার।

তারপর ২০১০ সালে এই জায়গাটি রাজ্য পূর্ত দপ্তরের হাত থেকে নিয়ে কলকাতা পুরসভা পার্ক বানাতে চেয়েছিল। ছাড়েনি তৎকালীন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকার। তারপর রাজ্যে পালাবদল। ২০১৮ সালে সব কেস মিটে যায় আদালতে। পূর্ত দপ্তরের থেকে জায়গাটি নিজেদের অধীনে নিয়ে আসে কলকাতা পুরসভা। তারপর ফিরহাদ হাকিম নতুন রূপ দেন।

হাজার খানেকেরও বেশি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে এই উদ্যানে। বহু পুরনো আম গাছ আছে। এছাড়াও নতুন করে আম, জামরুল, জাম, কলার মতো বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ লাগানো হয়েছে। লেগেছে নিম, গুলমোহর, রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া ছাড়াও নানা ধরনের ছোট পাতাবাহার গাছ। শহরের অন্যান্য পার্কের সঙ্গে এর ফারাক থাকছে।

অন্যান্য উদ্যানে ওয়াক ওয়েতে পেভার ব্লক বাঁধানো থাকে। কিন্তু এই প্রথম শহরের কোনও পার্কে পেভার ব্লক লাগানো হয় নি। মোরাম বিছানো রাস্তা দিয়েই হাঁটতে হবে। ওখানে মাছরাঙ্গা, পানকৌরি, বকের মত বিভিন্ন পাখি ভিড় জমায়। ফলে তাদের যেন কোনও অসুবিধা না হয়, সেটাও মাথায় রাখা হচ্ছে। এছাড়াও পুকুরে লাইলনটিকা, তেলাপিয়া এবং ডেঙ্গুর লার্ভা মারতে গাপ্পি মাছ ছাড়া হয়েছে।

সবমিলিয়ে প্রায় ২০০ মাছ ছাড়া হয়েছে। শালবগগা দিয়ে বাঁধানো হয়েছে পুকুর।স্থানীয় ৬৩ নম্বর ওয়ার্ড কো-অর্ডিনেটর সুস্মিতা ভট্টাচার্য্য (চট্টোপাধ্যায়) বলেন, এখানে প্রচুর পাখি, কাঠবিড়ালি রয়েছে। সেটা মাথায় রেখেই প্রচুর ফলের গাছ লাগানো হয়েছে। তাই বেশি উঁচু বাতিস্তম্ভও বদলে ছোট বাতিস্তম্ভ লাগিয়েছে পুরসভা। যাতে রাতের দিকে এই পাখি এবং অন্যান্য প্রাণীদের কোনও সমস্যা না হয়।

দেবাশিস কুমার বলেন, শহরের বুকে একটা নেচার পার্ক করতে চেয়েছি আমরা। ওখানে প্রচুর দেশি-বিদেশি পাখি আসে। তাই, যতটা সম্ভব কংক্রিটের কাজ কম করে পরিবেশবান্ধব জিনিস দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে। ভিতরে আছে ‘ওপেন এয়ার জিম’। যেখানে ভ্রমণকারীরা ইচ্ছা হলে বিনামূল্যে শরীরচর্চা করতে পারবেন।

আরও পড়ুন