রানার প্রতিবেদন : তৎকালীন ব্ৰিটিশ সাম্ৰাজ্যের দোৰ্দণ্ডপ্ৰতাপশালী মহারানি ভিক্টোরিয়া ও তাঁর স্বামী প্ৰিন্স অ্যালবাৰ্টের পরিবার অত্যন্ত সুখী সংসার হিসেবে বাইরের দুনিয়ায় পরিচিত হলেও বাস্তবতা ছিল সম্পূৰ্ণ অন্যরকম। আসলে সে সংসারেও গৃহদাহ ছিল। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে ভিক্টোরিয়া নিজের সন্তানদের পেছনে গুপ্তচর পৰ্যন্ত লাগিয়ে রেখেছিলেন।
ইতিহাস লেখক জেন রিডলি তাঁর ‘বেৰ্টি: আ লাইফ অব এডওয়াৰ্ড দ্য সেভেন্থ’ বইয়ে এমনটাই দাবি করেছেন। গবেষণামূলক এই বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভিক্টোরিয়া ও অ্যালবাৰ্ট প্ৰেম করে বিয়ে করেছিলেন। তাঁরা পাঁচ মেয়ে ও চার ছেলে, মোট নয় সন্তানের জন্ম দেন। বিভিন্ন চিত্ৰকৰ্ম ও আলোকচিত্ৰে ওই দম্পতি এবং তাঁদের সন্তানদের দেখে অত্যন্ত সুখী মনে হয়।
পরস্পরের প্ৰতি তীব্ৰ আকৰ্ষণ সত্ত্বেও ওই তরুণ দম্পতির মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছিল তীব্র। রানি হিসেবে ভিক্টোরিয়া তাঁর দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন বাধার মুখে পড়েন। এজন্য তিনি স্বামীকেই পরোক্ষভাবে দায়ী মনে করতেন। গৰ্ভাবস্থার কারণে রাজকাৰ্য থেকে তাঁকে দীৰ্ঘ সময় দূরে থাকতে হয়েছে। স্বামীর প্ৰতি যথেষ্ট অনুরাগ সত্ত্বেও রাজকাৰ্যে বিঘ্ন ঘটায় ভিক্টোরিয়া মনে মনে অ্যালবাৰ্টের প্ৰতি খুবই অসন্তুষ্ট ছিলেন।
স্বামী-স্ত্ৰীর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে তীব্ৰ মতবিরোধ ছিল এবং ভিক্টোরিয়ার বদরাগি স্বভাবকে রীতিমতো ভয় পেতেন স্বামী অ্যালবাৰ্ট। রাজা তৃতীয় জৰ্জের পাগলামি উত্তরাধিকার সূত্ৰে ভিক্টোরিয়ার মধ্যে দেখা দিতে পারে, অ্যালবাৰ্টের মনে এ-রকম একটা আশঙ্কাও ছিল। সেকথা তিনি ঘনিষ্ঠদের কাছে বলতেনও। ভিক্টোরিয়া অনেক সন্তানের জন্ম দিলেও গৰ্ভধারণে তাঁর প্রচণ্ড অনীহা ছিল।
একের পর এক সন্তানের জন্ম দেওয়াকে তিনি মোটেও পছন্দ করতেন না। ব্যাপারটিকে খরগোশ বা গিনিপিগের যৌনতার সঙ্গে তুলনা করতেন তিনি। কিন্তু স্বামীর মাত্রাতিরিক্ত যৌনতার ছাপেই তাঁরও এতগুলো সন্তান হয়ে যায়। সেটা নিয়ে বিব্রত থাকতেন মহারানি। এমনকি ব্লাউজ তুলে স্তন বার করে সন্তানদের বুকের দুধ পান করানোর বিষয়টিও তাঁর কাছে অত্যন্ত বিরক্তিকর একটি ব্যাপার ছিল।
নিজের মেয়েদেরও তিনি এ-ব্যাপারে নিষেধ করতেন। বলতেন, ‘সন্তানদের বুকের দুধ কক্ষনো দেবে না। দৃশ্যটা অত্যন্ত কুরুচিকর। বিরক্তিকরও।‘ বড় ছেলে বেৰ্টি ওরফে সপ্তম এডওয়াৰ্ডকে ভয়ংকর অপছন্দ করতেন ভিক্টোরিয়া। তাঁর মুখ দেখতে চাইতেন না। মায়ের দৃষ্টিতে বেৰ্টি ছিলেন ‘অসুন্দর’ ও ‘অসম্পূৰ্ণ’ এক পুরুষমানুষ।
১৯ বছর বয়সে আয়ারল্যান্ডে এক সামরিক প্ৰশিক্ষণ গ্ৰহণকালে নেলি ক্লিফডেন নামের এক যৌনকর্মীর সঙ্গে কেলেংকারিতে জড়িয়ে পড়েন এডওয়াৰ্ড। রাজপরিবারের ছেলের এমন অধঃপতনে ভেঙে পড়েছিলেন প্ৰিন্স অ্যালবাৰ্ট। তিনি বেৰ্টির সঙ্গে কেমব্ৰিজে দেখা করে অসুস্থ অবস্থায় উইন্ডসরে ফিরে আসেন। কয়েকদিন পরেই মারা যান।
সম্ভবত টাইফয়েড বা অন্য কোনও রোগে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু এই মর্মান্তিক ঘটনার জন্য ছেলে বেৰ্টিকেই দায়ী মনে করতেন ভিক্টোরিয়া। এরপর নিজেকে একরকম গুটিয়ে নেন ভিক্টোরিয়া। পরবতী ৪০ বছর তাঁকে জনসমক্ষে খুব কমই দেখা গেছে। তবে সন্তানদের সবার ওপর তাঁর কঠোর নিয়ন্ত্ৰণ ছিল সব সময়। তিনি সন্তানদের সবার পেছনে গুপ্তচর নিয়োগ করেছিলেন।
ভিক্টোরিয়া তাঁর ‘অপ্ৰিয় সন্তান’ বেৰ্টিকে কখনও সরকারি কাজকৰ্মে যুক্ত হতে দেননি। বড় ছেলের সঙ্গে ভিক্টোরিয়া ‘নিজের অনেক মিল’ খুঁজে পেয়েছিলেন। আর সেটিই ছিল তাঁর সঙ্গে বেৰ্টির সঙ্গে তাঁর বিরোধের কারণ। তারপরেও মায়ের সঙ্গে কখনও সম্পৰ্ক ছিন্ন করেননি বেৰ্টি। পরে ৫৯ বছর বয়সে রাজার দায়িত্ব নিয়ে তিনি বেশ সফল হন এবং মায়ের যোগ্য সন্তান হিসেবেই নিজেকে প্ৰমাণ করেন।
