ক্লান্ত লাগছে? আপনি কি রক্তাল্পতার শিকার? জেনে নিন এর মোকাবিলার উপায়

|

রানার প্রতিবেদন : এতদিন আমরা সচরাচর আয়রন ডেফিসিয়েন্সি অ্যানিমিয়ার কথা শুনে এসেছি।কিন্তু অ্যানিমিয়া অনেকরকমের হয়, তার মধ্যে অন্যতম প্ৰধান হল মেগালোব্লাসটিক অ্যানিমিয়া ( Megaloblastic Anemia )। এটি রক্তের এমন একটি অসুখ, যেখানে লোহিত রক্তকণিকার ( Red blood cell ) সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ কম থাকে। লোহিত রক্তকণিকা বিভিন্ন কোষ ও শরীরের সমস্ত অঙ্গে অক্সিজেন ( Oxygen ) সরবরাহ করে। কিন্তু শরীরে যদি পর্যাপ্ত লোহিত কণিকা না থাকে, তাহলে কোষ, টিসু্সহ অঙ্গগুলিও প্ৰয়োজনীয় অক্সিজেন থেকে বঞ্চিত হবে।

এক-একটা অ্যানিমিয়ার কারণ ও ধরন ভিন্ন হয়। মেগালোব্লাসটিক অ্যানিমিয়ায় লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা তো কম থাকেই, পাশাপাশি যেটুকু কণিকা থাকে, তার আকারও অস্বাভাবিক বড় হয়। শরীরে ভিটামিন বি টুয়েলভের ( Vitamin B12 ) অভাব হলে এই অ্যানিমিয়া হয়। এর অপর নাম ফোলেট ডেফিসিয়েন্সি অ্যানিমিয়া। মেগালোব্লাসটিক অ্যানিমিয়া তখনি হয়, যখন মানবরক্তে লোহিতকণিকা ঠিকভাবে তৈরি হয় না। আর এক্ষেত্ৰে লোহিত কোষগুলি এত বড় হয় যে তারা ব্যোন ম্যারো ভেঙে রক্তপ্ৰবাহে মিশে ঠিকঠাকমতো অক্সিজেন সরবারহ করতে পারে না।

এর অন্যতম প্ৰধান কারণ হল শরীরে ভিটামিন বি টুয়েলভের অভাব। ভিটামিন বি টুয়েলভ ও ফোলেট লোহিতকণিকা তৈরির অত্যন্ত গুরুত্বপূৰ্ণ উপাদান। রেডমিট, মাছ, ডিম ও দুধে ভিটামিন বি টুয়েলভ পাওয়া যায়। কিন্তু কিছু ব্যক্তির শরীরে খাবার থেকে এই পুষ্টি উপাদান সরাসরি শোষিত হতে পারে না, আর তখনি হয় মেগালোব্লাসটিক অ্যানিমিয়া। আর এর কারণ হল অন্ত্ৰে ইনট্ৰিনসিক ফ্যাক্টর নামের একটি বিশেষ প্ৰোটিনের অভাব, এই প্ৰোটিনের অনুপস্থিতিতে ভিটামিন বি টুয়েলভ শরীরে ঢুকতে পারে না।

এর অপর একটি কারণ শরীরে ফোলেটের অভাব। স্বাস্থ্যকর লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে ফোলেটেরও একটা কাৰ্যকারী ভূমিকা আছে। মেটে, পালংশাক, ছোলাসেদ্ধতে পাওয়া যায় ফোলেট। ফোলেট ফলিক অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্ৰিয়া করে লোহিত কণিকা তৈরিতে সাহায্য করে। কিন্তু কেউ যদি মাত্ৰাতিরিক্ত মদ্যপান করে, তাহলে শরীরে ফলিক অ্যাসিড ( Folic Acid ) ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। গৰ্ভবতী মহিলাদের শরীরে প্ৰায়ই ফোলেটের ঘাটতি দেখা দিয়ে তাঁদের মেগালোব্লাসটিক অ্যানিমিয়াতে আক্ৰান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

কিন্তু গৰ্ভস্থ ভ্ৰূণের জন্য তখন শরীরে বেশি পরিমাণে ফোলেটের প্ৰয়োজন হয়। এই অ্যানিমিয়ার সবচেয়ে বড় উপসৰ্গ হল অল্পেতেই ক্লান্ত হয়ে পড়া, যদিও সব অ্যানিমিয়ার প্ৰথম প্ৰকাশ ঘটে ক্লান্তি দিয়ে, তবে এইক্ষেত্ৰে ক্লান্তিটা একটু বেশিই কাবু করে। সারাদিন শুয়ে বসে থাকলেও যেন মনে হয় ক্লান্তি আর কাটতেই চাইছে না।

তবে উপসৰ্গগুলি একেক জনের ক্ষেত্ৰে একেক রকম হয়, কারও দু-তিনটি কারও-বা চার-পাঁচটি উপসৰ্গ থাকে, মূলত যেগুলি কমন, তা হল– শ্বাসকষ্ট, পেশিতে দুৰ্বলতা, মনে হয় যেন ভেঙে যাচ্ছে, ত্বক অস্বাভাবিক রকমের ফ্যাকাশে হয়ে যায়, গ্লসাইটিস (জিভ ফুলে যাওয়া), খিদে চলে যাওয়া, ওজন কমে যাওয়া, ডায়ারিয়া, গা বমি ভাব, হাৰ্টবিট অস্বাভাবিক রকমের বেড়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা রোগটি বাড়াবাড়ির পযায়ে গেলে, সঙ্গে হাত-পা ঝিনঝিন করা। কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট বা সিবিসি পরীক্ষা করলেই প্ৰাথমিকভাবে আন্দাজ করা যায়।

সেখানেই রক্তে লোহিত কণিকারþ আকার, আয়তন, সংখ্যা সমস্ত কিছু খুঁটিয়ে পৰ্যবেক্ষণ করা হয়। যদি কারও মেগালোব্লাসটিক অ্যানিমিয়া থাকে তাহলে লোহিত রক্তকণিকা আকৃতিতে বিশাল হয় ও সম্পূৰ্ণভাবে গঠিত হয় না। ভিটামিন বি টুয়েলভ ও ফোলেটের মাত্ৰাও দেখা হয়। এছাড়াও স্কিলিং টেস্ট বলে বিশেষ ধরনের একটি রক্তপরীক্ষা করা হয়, যার মাধ্যমে দেখা হয় আপনার শরীর কতটা ভিটামিন বি টুয়েলভ শোষণ করতে পারছে। এছাড়াও বিশেষ কয়েকটি ক্ষেত্ৰে ইউরিন পরীক্ষাও করানো হয়।

কেন মেগালোব্লাসটিক অ্যানিমিয়া হয়েছে তার উপরই নিৰ্ভর করে রোগীকে কোন চিকিৎসা দেওয়া হবে। এছাড়াও চিকিৎসার সময় রোগীর বয়স ও তার সামগ্ৰিক স্বাস্থ্যের কথাও মাথায় রাখা হয়। কারণ যদি ভিটামিন বি টুয়েলভের অভাব থেকে মেগালোব্লাসটিক অ্যানিমিয়া হয়, তাহলে তাকে নিৰ্দিষ্ট ভিটামিনের সাপ্লিমেন্ট খেতে হয়, সঙ্গে ডিম, চিকেন, সিরিয়ালস, রেডমিট, দুধ বেশি করে খেতে বলা হয়। একইভাবে শরীরে যদি ফোলেটের অভাব হয়, তাহলে ফোলেট সাপ্লিমেন্ট নিতে হবে।

কমলালেবু, কাঠবাদাম, পালংশাক, ব্ৰকোলি, হোল গ্ৰেন রাইস, ওটস থেকে ফোলেটের চাহিদা পূরণ হয় শরীরে। একটা কথা মনে রাখবেন মেগালোব্লাসটিক অ্যানিমিয়ার কারণ যদি হয় ভিটামিন বি টুয়েলভের অভাব, তাহলে তা থেকে অন্যান্য অনেকরকম শারীরিক সমস্যা হয় যদি সঠিক সময়ে শরীর চিকিৎসা না পায়। স্নায়ুর ক্ষতি, স্নায়ুতন্ত্ৰের ডিজঅডার, খাদ্যনালীতে সংক্ৰমণ এর মধ্যে ভীষণই কমন।

আরও পড়ুন