রানার প্রতিবেদন : ব্যস্ত রাজপথের ধারে এক চিলতে ছোট্ট দোকান, মোটেই চোখে পড়ার মতো নয়। দোকানে ঢোকার মুখে জীর্ণ সাইনবোর্ড: ‘হেমেন অ্যান্ড কোং / সেতার, সরোদ, তানপুরা, এসরাজ ও হারমোনিয়াম ইত্যাদি তৈয়ারী ও মেরামত করা হয়’। পাশের ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ডে বয়ানটা একটু আলাদা: এক্সপোর্টার, ম্যানুফ্যাকচার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’, যার নিচের লাইনে উক্ত বাদ্যযন্ত্রগুলোর নাম।
সব মিলিয়ে দেখে বোঝার উপায় নেই, ৭৩ বছরের সোনালি ইতিহাস আগলে বসে আছে ১৭৪/এ রাসবিহারী এভিনিউর এই এক চিলতে বিপণী। গাড়ি-ঘোড়ার আওয়াজ আর মানুষের কোলাহল পেছনে ফেলে এই ছোট্ট দোকানের চৌকাঠ পেরোলেই এক অন্য জগৎ। এক শান্ত নীরবতার মাঝে থেকে থেকে সেতার, সরোদ, গিটার বা তানপুরার টুংটাং। দোকানের ধুলোর আস্তরণ পড়া তাকে, সিলিং থেকে ঝুলিয়ে রাখা বা দেওয়াল জুড়ে সাজিয়ে রাখা নানাবিধ বাদ্যযন্ত্র।
দেখে কে বলবে, এই অপরিসর চৌকাঠ পেড়িয়েই এখানে একদা পায়ের ধুলো পড়েছিল ভীমসেন জোশী, নুসরত ফতেহ্ আলি খাঁ, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে পণ্ডিত রবিশঙ্কর, এমনকী ইহুদি মেনুহিন, বিটল তারকা জর্জ হ্যারিসনের মতো সংগীত জগতের দিকপালদের। এঁদের মধ্যে অনেকেরই রীতিমতো নিয়মিত যাতায়াত ছিল হেমেন অ্যান্ড কোম্পানির এই সুরের মহাফেজখানায়। তাঁরা আসতেন মনের মতো যন্ত্রের টানে, কঙ্ক্ষিত ধন নিয়ে ফিরে যেতেন খুশি হয়ে।
সেই সোনালি ইতিহাসের ধারাবাহিকতার সাক্ষ্ম বহন করছে দোকানের একপাশের দেওয়াল জুড়ে সাজানো ফ্রেমে বাঁধানো একাধিক ফোটোগ্রাফ। শুধু ভারতেই নয়, হেমেন অ্যান্ড কোম্পানির খ্যাতি ছড়িয়েছিল দেশের সীমানা টপকে বিদেশি সংগীত জগতে। এই বাদ্যযন্ত্র বিপণীর মালিক তথা প্রতিষ্ঠাতা হেমেন চন্দ্র সেন নিজের হাতে তৈরি করতেন এইসব যন্ত্র। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সেরা জিনিসটি নিয়ে এসে তিল তিল করে রূপ দিতেন সেতার, সরোদ, তানপুরার।
বিশ্বাস করতেন, যন্ত্রটা নিজে না বাজালে, তার সুরের খুঁটিনাটি হৃদয়ঙ্গম না করলে সেরা জিনিসটি তৈরি করা যায় না। শোনা যায়, শৈশব থেকেই ছিল তাঁর সংগীতের প্রতি অসীম আগ্রহ। কথিত আছে, তিনি নিজেও সেতার শিক্ষা শুরু করেন মাত্র ১০ বছর বয়সে। তাঁর বয়স যখন ১৩, পূর্ববঙ্গ থেকে কলকাতায় এসে তালিম নিতে শুরু করেন মাইহার ঘরানার বাবা আলিমুদ্দিন খানের কাছে। শিক্ষক হিসাবে পেয়েছিলেন উস্তাদ বাহাদুর খানের পিতা উস্তাদ আয়েত আলী খানকেও।
কাহিনীটা হল, একদিন আলাউদ্দিন খানের কাছে তালিম নেওয়ার সময় নিজের সেতারটি কোনোভাবে ভেঙে ফেলেন হেমেন চন্দ্র। সে সময় ওই সেতার সারিয়ে নেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁর ছিল না। ফলে নিজেই হাত লাগান মেরামতির কাজে। এবং সেটা করেও ফেলেন অদ্ভুত দক্ষতার সঙ্গে। যা দেখে বিস্মিত তাঁর শিক্ষাগুরু। শুধু আয়েত আলি খান নন, হেমেন চন্দ্রের দক্ষতা ও হাতের জাদু দেখে সেদিন অবাক হয়েছিলেন আলি আকবর খাঁ, রবিশঙ্করের মতো দিকপাল শিল্পীরাও।
সেই শুরু। শুধু আলাউদ্দিন খাঁ নন, পণ্ডিত নিখিল ব্যানার্জি, অন্নপূর্ণা দেবী, উস্তাদ হাফিজ আলি খাঁ, উস্তাদ আমজাদ আলি খাঁয়ের যন্ত্র সারাতে সারাতে কখন যে নিজেই ইতিহাসের এক অধ্যায় হয়ে উঠছেন, তা বোধকরি নিজেও জানতেন না হেমেন চন্দ্র। যত না ব্যবসার টানে, তার চেয়েও বেশি বিখ্যাত সংগীত শিল্পীদের প্রয়োজনের তাগিদে ১৯৪৭-এ প্রতিষ্ঠিত হল হেমেন অ্যান্ড কোম্পানি।
এই কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০০৩ সালে হেমেন চন্দ্রের হাতে হাফিজ আলি খাঁ লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার তুলে দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী। রাসবিহারী এভিনিউর এক চিলতে দোকানে বসে আজ সেই পারিবারিক ব্যবসা সামলাচ্ছেন হেমেন চন্দ্রের দুই ছেলে তপন ও রতন সেন। তবে তাঁরা বিশ্বাস করেন, নিছক ব্যবসা নয়, হেমেন চন্দ্র তাঁর হাতের জাদুতে গোটা বিশ্বের সংগীত জগতকে এক অদৃশ্য সম্পর্কের সুতোয় বেঁধেছিলেন।
যার ঠিকানা ১৭৪/এ রাসবিহারী এভিনিউ। সেই ঐতিহ্যকেই বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন তাঁরা। অধুনা যুগে সংগীত এক খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এই অস্বস্তিকর অনুভব নিয়েও তাঁরা জানেন, কলকাতার হেমেন অ্যান্ড কোম্পানির আপাত জীর্ণ দোকানঘর অনেক নতুন গজিয়ে ওঠা ঝাঁ চকচকে মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট স্টোরকে হেলায় টক্কর দিচ্ছে, এখনও।
