নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা : করোনায় তাল কেটে গিয়েছে ওদের জীবনে! যেন সুর ছন্দ হারিয়ে যেতে বসেছে। উৎসব বা আনন্দ অনুষ্ঠানে ট্রাম্পেট বা ড্রামে একের পর এক গানের সুর বাজিয়ে মনোরঞ্জন করেন ব্যান্ডের বাজনাদাররা। গত দেড় বছর ধরে সেভাবে অর্ডার না পেয়ে জীবনের যেন তথৈবচ অবস্থা। মাঝের শীতের মৌসুমে কিছুটা হাল ফিরছিল। কিন্তু ফের লকডাউনে কার্যত মাঠে মারা যাওয়ার জোগাড়।
কলেজ স্ট্রিট মোড় থেকে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ যেতে এমজি রোডের বা দিক ধরে খানিকটা হাঁটলেই এক এক করে ব্যান্ড পার্টির অফিস। ক্যালকাটা, মেহবুব, খুশবু ব্যান্ড। অন্য বছরগুলোয় এসময় গেলে দম ফেলার সময় থাকে না মালিক বা ম্যানেজারের। অর্ডার দেওয়ার জন্য একাধিক ক্লাবের সংগঠকদের ভিড় উপচে পড়ে অফিস বা কাউন্টারগুলির সামনে। চলে দর কষাকষি।
গত দেড় বছর ধরে ঠিক তার উল্টো ছবি। অফিস খুলে কার্যত মাছি তাড়াচ্ছেন মালিক-ম্যানেজাররা। এমনই অবস্থা যে অফিস খোলা থাকলে যে লাইট ও পাখা চলে সেই বিদ্যুৎ খরচের টাকাও উঠছে না। আগে সপ্তাহের প্রতিদিন কম পক্ষে একটা দুটো হলেও অর্ডার আসত। শারদোৎসব, দীপাবলি, ছট উৎসব, জগধাত্রী পুজো পর্যন্ত ঘুমানোর সময় ছিল না তাসা থেকে ব্যান্ডের বাজনাদারদের।
একটি ভাসান সেরে এসে আরও একটিতে যেতে হতো। ৪ থেকে ৫টা করে প্রতিদিন অর্ডার থাকত। ১০ জনের গ্রুপ হলে কম করে ১০ থেকে ১২হাজার টাকা ভাড়া। সেখান থেকে মাস্টারকে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা ও বাকিদের ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা করে পারিশ্রমিক দেওয়া হতো। এছাড়া পোশাক ও বাজনার রক্ষণাবেক্ষণে বেশ কিছু টাকা খরচ করেও ৩-৪হাজার টাকা প্রতি অর্ডারে ঘরে আসত মালিকদের।
এখন সেটুকুও উঠছে না। ক্যালকাটা ব্যান্ডের মুস্তাক শেখ জানান, লকডাউন হতেই আমাদের ব্যান্ডের ব্যবসাও সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। তখন আমার কাছে যে সমস্ত ব্যান্ড শিল্পীরা ছিলেন তাঁদের মাস খানেক নিজের সামর্থ্যে দুবেলা খাবার ব্যবস্থা করেছি। তারপর আর আমিও পারিনি। স্কুলে টাকা জমা দিতে না পাড়ায় ছোট্ট মেয়ে অন লাইন ক্লাস করতে পারেনি। ছেলেকে নতুন ক্লাসে ভর্তি করে উঠতে পারিনি।
দাদু বাবা থেকে আমি তিন প্রজন্ম ধরে এই ব্যবসা। ব্যান্ড বা তাসা মালিকদের থেকেও বেশি সমস্যায় মজুরির বিনিময় বাজনা বাজানো শিল্পীদের। গত দেড় বছর ধরে এই দোটানায় দীর্ঘ দিন কর্মহীন থেকেছেন তাঁরা। পরে কেউ চাষ বা কেউ গাড়ি চালানোর মতো অন্য পথে রোজগার করেছেন সামান্য। ফের ফিরেছেন কলকাতায় ফিরেছিলেন। এমনি এক বাজনা শিল্পী শেখর লোহার জানান, তিনি মুর্শিদাবাদের কান্দির বাসিন্দা।
গতবার লকডাউন মিটতেই শীতে কলকাতায় এসেছিলাম। কিছু আয় হচ্ছিল। কিন্তু এখন আবার যে কে সেই অবস্থা! তাই ছোলা, ঝুড়িভাজা ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে দুবেলা পেটের ভাত জোগাড় করছি। পোশাক পড়ে বসে আছি। যদি কোন খদ্দের আসে। বিয়ে বাড়িতে মাত্র ৫০ জন। এমন অবস্থায় কেউ কি আর ব্যান্ড বাজায়! দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন মোস্তাক হোসেন। এরা তো কয়েকটি নামমাত্র। পেশার সঙ্গে যুক্ত প্রায় দু’হাজার পরিবার এখন বসে শুধু অনিশ্চিত এক সুদিনের অপেক্ষায়।
