“অবহেলিতের দেবতা”, সিনেমা নয় বাস্তব, কলকাতার হিরো দেবকুমার

|

রানার প্রতিবেদন : এই ইট-কাঠ-কংক্রিটের শহরে ক্রমশই যেন দুর্লভ হচ্ছে স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা। অর্থের জন্য ইঁদুর দৌড়ের এই যুগে কমছে বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের স্বাভাবিক টান, ভালোবাসা, কর্তব্য। পরিণতিতে কলকাতা শহরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে বৃদ্ধাবাস। তবে সেখানেও তো ফেলো কড়ি মাখো তেল। বৃদ্ধাবাসেও প্যাকেজ। দামি প্যাকেজে দামি পুষ্টিকর খাবার, বড় বড় ঘর।

যার সে ক্ষমতা নেই, তার কপালে কম দামি প্যাকেজে কোনোরকমে গ্রাসাচ্ছাদন, মাথা গুঁজে জীবনের শেষ ক’টা দিন কাটিয়ে দেওয়াই ভবিতব্য। তবে কারো কারো কপালে সেটুকুও জোটে না। এই শহরের এমনই হতভাগ্য অন্তত তিনশো বয়স্ক মানুষের কাছে সাক্ষাত ‘দেবদূত’ হয়ে উঠেছেন দেবকুমার মল্লিক। কি শীত, কি গ্রীষ্ম, কি বর্ষা, ওঁরা জানেন, তাঁদের ওই ‘ছেলে’ দু’বেলার খাবারটা ঠিক পৌঁছে দেবেন তাঁদের কাছে।

পৃথিবী রসাতলে গেলেও এর অন্যথা হবে না, এই বিশ্বাসে বুক বেঁধে স্বস্তি পান এই অশক্ত বৃদ্ধ মানুষগুলো। শুধু কি খাবার! অসুখ বিসুখ হলে,বা একঘেয়ে জীবনে কাছেপিঠে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা হলেও মুস্কিল আসানের মতো হাজির দেব কুমার। পেশায় ব্যবসায়ী, আজীবন কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে জীবনের চল্লিশটা বসন্ত পার করে এসেছেন বরানগরের বাসিন্দা দেব কুমার।

জানালেন, ‘অনেক বৃদ্ধ মানুষকে দেখেছি পথেঘাটে দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে দিন গুজরান করতে। এমনকী অনেককেই দেখেছি সন্তানরা ছেড়ে চলে যাওয়ায় বাড়িতে একাকিত্বের যন্ত্রণা নিয়ে ছেঁড়া চট গায়ে জড়িয়ে, আধপেটা খেয়ে কোনও রকমে দিন কাটাচ্ছেন। কাজ করে খাওয়ার মতো সামর্থ্য নেই ওই বৃদ্ধ মানুষগুলোর। একলা জীবনের সঙ্গী বলতে চরম দারিদ্র্য।’

এই অসহায় মানুষগুলোর নিত্যদিনের অব্যক্ত যন্ত্রণা অনুভব করেই তাঁদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন দেবকুমার। ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন গরিবি, কৃচ্ছ্রসাধন কাকে বলে। জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা বরানগরে। বাবা-মা, কয়েক বছরের বড় দাদাকে নিয়ে ছিল তাঁদের চারজনের স্বচ্ছল সুখের সংসার। কিন্তু তাঁর বয়স যখন পাঁচ বছর, এক সড়ক দুর্ঘটনা সবকিছু ওলট পালট করে দেয়।

দুর্ঘটনায় জীবনের মতো পক্ষঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানা নেন বাবা। বাবার চিকিৎসা আর পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে টিউশ্যন এবং সেইসঙ্গে পার্টটাইম ফিজিওথেরাপি প্রশিক্ষকের কাজ শুরু করেন মা। এরই মধ্যে সাংঘাতিক মানসিক সমস্যা দেখা দেয় দাদার। চিকিৎসার জন্য তাঁকে পাঠাতে হয় মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে। দেব কুমার জানাচ্ছেন, ‘আমাদের জন্য রান্না করে ভোরবেলা কাজে বেরিয়ে যেতেন মা।

ফিরতেন দাদাকে দেখে।’ মাঝে প্রায় গোটা সময়টা অশক্ত বাবার দেখাশোনা করতে হতো তাঁকেই। এরই মধ্যে ছিল নিজের পড়াশোনা। পঞ্চাশ পয়সা নিয়ে স্কুলে যেতেন। রঙিন টিফিন বাক্সে ভরপেট খাবার নিয়ে স্কুলে যাওয়া ছিল তাঁর কাছে স্বপ্নের অতীত। গরিব বলে সমবয়সী ছেলেরাও তাঁকে কাছে ঘেঁষতে দিত না।হায়ার সেকেন্ডারি পড়ার সময় দেব কুমার স্থানীয় ক্যাটারিংয়ে ওয়েটারের কাজ নেন।

পয়সা‌, সম্মান কোনোটাই তাতে তেমন জুটত না। তবে মালিক দয়া করে এটা সেটা খাবার বাড়ি নিয়ে আসতে দিতেন। অসুস্থ বাবার জন্য সেসব নিয়ে আসতেন দেবকুমার। তবে এত কষ্টের মধ্যেও জীবনে বড় হওয়ার, কিছু করে দেখানোর ইচ্ছাটা উঁকিঝুঁকি মারত তাঁর মনের কোণে। অবশেষে কলেজে পড়ার সময় দু’পয়সা রোজগারের আশায় কপাল ঠুকে গুজরাট পাড়ি দেন দেব কুমার।

ভাগ্যান্বষণে সুরাট, প্যাটেলনগরের রাস্তায় রাস্তায় কয়েক দিন ঘোরার পর কাজ পেয়ে যান এক অটো-এমব্রয়ডারি কারখানায়। দেব কুমার জানান, সেখানে ৯ দিন কাজ শিখেছিলেন তিনি, আর ফিরে এসে ৯ বছর পর তিনি নিজেই এখন কারখানা, জয়রাম গার্মেন্টস-এর মালিক। বাড়ি ফিরে আসার কয়েকমাস পর বাবা মারা যান, সারা জীবন হারভাঙা পরিশ্রমের পর মাও ভালো চোখে দেখেন না।

তবু দেব কুমার আজ স্বনির্ভর। শুধু নিজের পরিবার নয়, আজ তাঁর মুখ চেয়ে থাকেন ওই এলাকার নানা প্রান্তের কয়েকশো বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। এই কর্মকাণ্ড কলকাতার অন্যান্য প্রান্তেও ছড়িয়ে দিতে চান দেব কুমার। ২০১৫ সাল থেকে এই মহান কাজে অনলসভাবে সক্রিয় তিনি। জানান, অসহায় বৃদ্ধ মানুষগুলোর ভরণপোষণের জন্য দিনে অন্তত ৪,৮০০ টাকা খরচ করেন তিনি।

তাঁর কাজে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছেন অন্তত ৬৪ জন স্বেচ্ছাসেবী, বৃদ্ধ মানুষগুলোর মুখের কাছে ভাত-ডাল-সবজি তাঁরাই পৌঁছে দিয়ে আসেন। কখনও কখনও মিষ্টি। রয়েছে দু’টি গাড়িও, আপদে বিপদের জন্য। অনেকেই নগদ অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে চেয়েছেন দেব কুমারের এই মহান কাজে। কিন্তু ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি।

জানিয়ে দিয়েছেন, নগদে নয়, চাল-ডাল বা অন্য কোনও সামগ্রী নিতে আপত্তি নেই। এখন দেব কুমারের নিজের সংসার বলতে স্ত্রী ও এক মেয়ে। কিন্তু বরানগর, আগরপাড়া, পানিহাটি, সোদপুরের কয়েকশো মানুষের কাছে তিনি ঘরের ছেলে। যাকে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। সব মিলিয়ে সংসারটা তাঁর বেশ বড়।

আরও পড়ুন