করোনা ফিরিয়ে এনেছে নির্মল প্রকৃতি, এবার ফিরছে প্রাণের উৎসবে পবিত্র সাবেকিয়ানা

|

রানার প্রতিবেদন : দীর্ঘ বছর পর কলকাতা সহ গোটা বঙ্গে বাঙালির উৎসব আবার ফিরে আসছে তার সাবেকি চেহারায়। সৌজন্যে করোনা। এই পরিবর্তন অনেকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, “এখন পুজোকে ঘিরে নিষ্ঠা নেই, নেই সেই হুটোপুটি করা আনন্দ। এখন প্যান্ডেল দেখতে মানুষের দীর্ঘ মিছিল। আলো আর থার্মোকলের ঝিকিমিকি ঢেকে দিয়েছে উৎসবকে।” এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বললেন, অশীতিপর শিল্পী বিবেক পাল।

পাশে দাঁড়িয়ে আর এক প্রবীণ শিল্পী ফুট কেটে বললেন, মনে করে দেখুন, আগে বাতাসে গন্ধ ভেসে বেড়াতো এই কলকাতা শহরেই, একটা অদ্ভুত সুন্দর পুজো পুজো গন্ধ, সেটা যে কি তা হয়ত বুঝিয়ে বলতে পারবো না। তবে এখনও চোখ বুজে সেই গন্ধের অনুভূতি নিতে পারি। বাতাসে বিষ বাড়তে লাগলো আর কোথায় সব হারিয়ে যেতে লাগলো। আগে কলকাতায় ছ’টা ঋতুই টের পেতাম, এখন পাই না।

ছোট বেলায় কলকাতায় কাশ ফুলও নজরে এসেছে, আর এখন মাটিতে কাশ ফুল তো দূর, আকাশটাও হারিয়ে যাচ্ছে কুৎসিত বিজ্ঞাপনের হোর্ডিংয়ে। মানুষের এই অত্যাচার থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে স্বয়ং মা দুর্গাই হয়ত প্রকৃতিকে কলুষ মুক্ত করতে চাইছেন। কে জানে, তার কি ইচ্ছা। এটাও কি তার ইচ্ছা? প্রশ্ন শুনে ঘাড় ঘোরালেন বিবেক বাবু। জানতে চাইলেন, কোনটা? বললাম, এই যে আপনি এবার সব একচালার প্রতিমা তৈরি করছেন।

এই যে সব সাবেকি ঢঙে মূর্তি হচ্ছে, এটাও কি মায়ের ইচ্ছে? খুব হাসলেন বিবেক পাল, বললেন, পেটের দায়ে চালিয়ে যাচ্ছি বাপ-ঠাকুরদার পেশা। ছেলেগুলো আসতে চায়নি, আমি জোর করিনি। মূর্তি বানিয়ে এখন আর সংসার চলে না। যারা বিরাট বিরাট পুজোর অর্ডার পায়, তারা কিছুটা সামাল দিতে পারে। কিন্তু ইদানিং সেটাও হচ্ছে না। যারা থিমের মন্ডব বানায় সেই সব পয়সাওয়ালা থিম শিল্পীদের স্টুডিওতে তৈরি হয় মায়ের মূর্তি।

ফলে কুমোরটুলির জন্য এখন শুধু মধ্যবিত্তের বাজেট। বলতে পারেন ভালোবাসার সঙ্গে পেটের লড়াই আমাদের আরও তীব্র হচ্ছে। আমি চোখ বুজলেই এই নব্বই বছরের চালা ঘরে তালা পড়বে। ছেলে দুটো ফুটপাতে দোকান করে। কিছুক্ষন দম নিয়ে প্রবীণ শিল্পী বলেন, এবার চরম বিপর্যয় চারদিকে। মূর্তির কোনও অর্ডার নেই সেভাবে। যে কটা পেয়েছি সব একচালা। পেটের টান আরও কঠিন হবে এবার, কিন্তু কি জানেন, পরম তৃপ্তি নিয়ে মূর্তি গড়ছি এবার।

মা ফিরছেন সেই সাবেকিআনায়। বাতাস যেমন আবার নির্মল হচ্ছে। তেমনি আবার আকাশ হচ্ছে নিল। কাশ ফুলটা হয়ত আর ফিরবে না কিন্তু একচিলতে কৈশোর যেন ফিরে এসেছে আমার বুড়ো বয়সের চোরা গলিতে। জেলায় জেলায় একই ছবি। করোনার ছোবলে বাঙালির উৎসব এবার ফিকে। জলপাইগুড়ি কিংবা বীরভূম, সর্বত্র শুনশান কুমোরটুলি। সব জায়গা থেকে একই খবর আসছে, অর্ডার নেই।

বিবেক পালও একই তথ্য দিলেন। বললেন, প্রতিবার রথের মেলা থেকেই শুরু হয় মায়ের মূর্তির জন্য অর্ডার। এবার রথ গেলো কিন্তু অর্ডার এলো না। যে কয়েকটি পেয়েছি, সেগুলোই চলছে। এবার দেখবেন পুজোর সংখ্যা অনেক কমে যাবে। পুজো হয়ত হবে, তবে সেটা ঘট পুজো হলেও অবাক হবার কিছু নেই। বাকি যে সব পুজো হবে, সবই প্রায় একচালা প্রতিমা। অর্থ্যাৎ এবার থিম কিংবা প্যান্ডেলের দেখনদারি যে থাকছে না তা মায়ের মূর্তিই বলে দিচ্ছে।

বিবেক বাবুর পাশে দাঁড়িয়ে যিনি ফুট কেটেছিলেন তিনি আবার একতাল মাটি হাতে ফিরে এলেন আমাদের কাছে। আর চোখে তির্যক হাসি মাখিয়ে বললেন, আপনারা যাকে উৎসব বলেন, সেতো হয় টুনি বাল্ব নয়ত বাঁশ আর থার্মোকলের কারসাজি। আমরা যখন ছোট তখন পুজো মানে ছিল অন্য কিছু। মায়ের সেই একচালা অপূর্ব মূর্তি। মাকে ঠিক মায়ের মতোই লাগতো।

সামনে রাখা ওই মাটির সরার জলে ভেসে ওঠা দুর্গার মুখ, হেমন্ত’র পুজোর গানে শরতের আবাহন। জগৎ জুড়ে তখন শুধু আনন্দ ঘ্রাণ। আজ সেসব হাতড়ে বেড়াই। হয়ত মা আবার ফিরে আসবে সেই পরিবেশে, হয়ত এবারই।” কথা গুলো কানে বেজেই চলেছে, আর আমি যেন নিরুদ্দেশে হেটেই চলেছি সেই স্বপ্ন শরতের সন্ধানে।

আরও পড়ুন