গরিবের ঘরে শিক্ষা পৌঁছে দিচ্ছেন এক স্কুলছুট মাছওয়ালা

|

রানার ডেস্ক : দারিদ্র তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল শিক্ষার স্বপ্ন। অর্থের অভাবে স্কুলছুট হয়ে বেছে নিতে হয়েছিল অন্য জীবন। তবু ‘মাছওয়ালা’ বিশ্বনাথ নারু আজ গরিব ঘরের ছেলেমেয়েদের কাছে প্রিয় মাস্টারমশাই, তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভরসা। ভোরের আলো ফুটে কলকাতা ঘুম থেকে জেগে ওঠার অনেক আগেই বিশ্বনাথবাবু পৌঁছে যান পাতিপুকুরের মাছ বাজারে। অভিজ্ঞ চোখে খুঁজে নেন টাটকা মাছ।

তারপর দরাদরি, সওদা সেরে সেই মাছের পসরা নিয়ে চলে যান দমদম পার্ক বাজারে নিজের দোকানে। বেলা ১০ টার মধ্যে বেচাকেনা চুকিয়ে বিশ্বনাথবাবু অন্য মানুষ। ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে দ্রুত পায়ে পৌঁছে যান নন্দীপুর স্বামী বিবেকানন্দ বিদ্যামন্দির প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে তাঁর পথ চেয়ে থাকে একঝাঁক খুদে পড়ুয়া। গত প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে এই হল ‘মাছওয়ালা মাস্টারমশাই’ বিশ্বনাথ নারুর রোজকার রুটিন।

ওই স্কুলে খুদে পড়ুয়াদের অঙ্ক ও বিজ্ঞান পড়ান তিনি। এমনকী স্কুলের পরও তাদের নিয়েই অনেকটা সময় কাটে তাঁর। দরকার পড়লে কাউকে নিয়ে বসে যান বাড়তি ক্লাসেও। বাজারের লোকজনের কাছে বিশ্বনাথ নারু নিছক এক ‘মাছওয়ালা’, কিন্তু তাঁর স্কুলের ছেলেমেয়েদের কাছে তিনি শ্রদ্ধেয় ‘মাস্টারমশাই’। সত্তরের দশকের শেষ নাগাদ থেকে চলে আসছে এই রুটিন। শুরুর দিকে স্কুল বলতে ছিল একটা ছোট ঘর, সে ঘরে না ছিল বেঞ্চ, না ছিল বিদ্যুৎ, বর্ষায় জল পড়ত ঘরের চাল ফুটো হয়ে।

সেই এঁদো ঘরই আজ পুরোদস্তুর স্কুলবাড়ি। কাজটা যে নেহাত সহজ ছিল না সে কথা মানেন বিশ্বনাথবাবুও। তবে ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলোর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে সেই অসাধ্য সাধন করে চলেছেন তিনি। মাত্র ছ’মাস বয়সে বাবাকে হারান বিশ্বনাথবাবু। দুই সন্তানকে নিয়ে অভাবের সংসারে মা পড়েন অথৈ জলে। তবু অভাব অনটনের মধ্যেও দুই ভাইয়ের স্কুলের পড়াশোনা শুরু হয় প্রতিবেশীদের সাহায্যে।

কিন্তু দশম শ্রেণীর পর আর এগোন যায়নি। বিশ্বনাথবাবু ও তাঁর বোনের পড়াশোনায় যবনিকা নেমে আসে। অর্থের অভাবে স্কুলের পাঠ সাঙ্গ হল তাঁদের। ‘খুব ভেঙে পড়েছিলাম। নিরুপায় হয়ে কাজ নিলাম এক মাছের দোকানে,’ বলেছেন বিশ্বনাথবাবু। কিন্তু অর্থাভাব শিক্ষা জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি এক সময়ের এই মেধাবী পড়ুয়াকে। ১৮-র বিশ্বনাথ আশপাশের গরিব ঘরের ছেলেমেয়েদের পড়ানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।

বাস্তব ক্ষেত্রে এর জন্য অর্থের জোগান সহজ ছিল না। ফলে নিজের যেটুকু বিদ্যাবুদ্ধি আছে তা দিয়েই কিন্ডারগার্টেন থেকে চতুর্থ শ্রেণীর পড়ুয়াদের পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন তিনি। সেই শুরু। শুভানুধ্যায়ীদের সাহায্যে একশো ভাগ কুড়ি ফুট জমি নিয়ে শুরু হল স্কুল। স্কুল মানে সেই না আছে বেঞ্চ, না আছে ফ্যান, লাইট।

থাকার মধ্যে ছিল জনা ছয়েক স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক, লোকজনের দেওয়া কিছু বইপত্র আর রিক্সাচালক, দিনমজুর, বাড়ির কাজের লোকের গরিব কিছু ছেলেমেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে একটা মানুষের অদম্য ইচ্ছা। একটা সময় ক্যালকাটা আরবান সার্ভিসেস ও ইস্ট ইন্ডিয়া ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতা, স্থানীয় মুদিখানা মালিকের দেওয়া বাল্ব, ব্যাঙ্কের দেওয়া ফ্যান এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও লোকজনের আর্থিক অনুদানে গড়ে উঠল বিশ্বনাথবাবুর স্বপ্নের স্কুল।

তিনি জানিয়েছেন, ২০০০ সালে আর্থিক সংকটে পড়েছিল স্কুল। সেই সংকট কেটেছে। ৫০ টাকার জায়গায় ২০০ টাকা করে সাম্মানিক দেওয়া হচ্ছে শিক্ষকদের। তবু বাধা বিপত্তি আছে। তাঁর সামান্য আয় নিয়ে স্কুল চালানোয় পরিবারের আপত্তি আছে। এখনও জোটেনি সরকারি স্বীকৃতি। তবু অকপট বিশ্বনাথবাবু, এখন আর ফিরে তাকানোর সময় নেই, স্কুল বন্ধের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না তিনি। সুতরাং, চরৈবেতি, যত বাধাই আসুক। জানেন মাস্টারমশাই।

আরও পড়ুন