ভোর রাতে স্বপ্ন দেখলেন রানী রাসমণি, সাহেব বাগানে মাথা তুললো এই মহান বিস্ময়

|

রানার প্রতিবেদন : ১৮৪৭ সালেও নিয়ম করে বাৎসরিক তীর্থ দর্শনে বেড়িয়ে ছিলেন রানী রাসমণি । এবার যাবেন কাশি দর্শনে। সঙ্গে আত্মীয়-স্বজন, চাকর বাকর নিয়ে বিশাল দল। তৈরি হলো ২০ টা বজরা। সব প্রস্তুত। দক্ষিণেশ্বর ঘাটে পর পর তাঁবু টাঙানো হলো। লোক লস্কর নিয়ে রানী এসে পা রাখলেন সেই তাঁবুতে। সকাল হলেই ঘাট থেকে রওনা হবে ২০ টা বজরা। সেই রাতেই স্বপ্ন দেখলেন রানী।

অদ্ভুত স্বপ্ন। ঘুম ভেঙে গেল তার। স্বয়ং মা কালি এসেছেন তার স্বপ্নে। তিনি বলছেন, কোথায় তুই আমাকে খুঁজে বেড়াস? আমি এখানেই আছি, এখানেই আমার পুজোর আয়োজন কর। ভোর হতেই রানী তার স্বপ্নাদেশের কথা জানালেন সকলকে। তৎক্ষণাৎ নির্দেশ দিলেন এক মিনিট সময় নষ্ট করা যাবে না। এক্ষুনি কাজে হাত দিতে হবে। তৈরি করতে হবে অন্যতম সুন্দর এক মন্দির।

যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হলো কাজ। স্বাধীনতার ঠিক ১০০ বছর আগে দক্ষিনেশ্বের কালী মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করা হলো। আট বছর পর ১৮৫৫ সালে মন্দিরের উদ্বোধন হয় গোটা দেশকে জানান দিয়ে। বাঙালি স্থাপত্যের এমন অনিন্দ্য সুন্দর উদাহরণ আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য কলার উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এই মন্দির।

আট বছর ধরে ৯ লক্ষ টাকা খরচ করে ৩০০০০ একর জমির ওপর তৈরি হলো এই মন্দির। ঐতিহাসিক এই নির্মাণ কাজের জন্য যে জমি বেছে নেওয়া হলো সেটির একদিকে কবরস্থান অন্যদিকে ব্রিটিশ নাগরিক জ্যাক হেসটির বাগানবাড়ি। কিন্তু মায়ের স্বপ্নাদেশ, রানী রাসমণি শেষপর্যন্ত সাহেব বাগান কিনে নিলেন মন্দির তৈরির জন্য। কিছু এলাকা নিতে হলো পরিত্যক্ত এক কবরস্থানের জমি থেকে।

১৮৫৫ সালে ৩১ মে বিশাল উৎসবের আয়োজন করা হলো মন্দির উদ্বোধনের জন্য। গোটা দেশ থেকে একলক্ষ ব্রাহ্মনকে আমন্ত্রণ করে আনা হলো উদ্বোধনী যজ্ঞানুষ্ঠানে। মন্দিরের সব কাহিনী শেষপর্য্ন্ত চাপা পড়ে গেল একটি ছোট্ট নামের কাছে। গদাই। যিনি পরবর্তীকালে বিশ্বের দরবারে পরিচিত হন শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নামে। যিনি আজও হিন্দু ধর্মীয় দর্শনের অন্যতম দিশারী হিসাবেই পুঁজিত।

যিনি হিন্দু ধর্মের নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ স্বামী বিবেকানন্দের গুরু হিসেবেও বন্দিত। কিভাবে গদাই এসে পৌঁছলেন এই মন্দিরে? মন্দিরে প্রথম প্রধান পুরহিত হিসাবে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়কে নিয়োগ করেছিলেন রানী রাসমণি। রামকুমারের আস্তানা হলো মন্দির চত্তরেই। ওই মন্দির চত্তরেই নহবতখানার পাশে ছোট্ট একটা ঘরে এসে উঠলেন রামকুমারের ছোট ভাই গদাধর, যাকে সকলে ডাকত গদাই।

স্ত্রী সারদাকে নিয়ে ছোট্ট ঘরে থাকতেন আর দাদা রামকুমারকে পুজোর কাজকর্মে সাহায্য করতেন। মন্দিরের কাজকর্ম শুরু হবার পর মাত্র এক বছরের মাথায় মৃত্যু হলো রামকুমারের। রানী রাসমণির ইচ্ছেতেই প্রধান পুরহিত পদে দায়িত্ব নিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়। রামকৃষ্ণ পরমহংস নামটা একটু একটু করে ছড়াতে শুরু করেছে। জীবন দর্শন নিয়ে তার কথা শুনতে ভিড় করছে মানুষ।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে সব অমৃত বানি। রামকৃষ্ণ নামটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেল এই মন্দিরের সঙ্গে। রানী রাসমণি অনুভব করলেন,তার স্বপ্ন কিভাবে ফুলের মতো ফুটে উঠছে দক্ষিনেশ্বরের গঙ্গা তীরে। সেই পরম সন্তোষ তিনি ব্যক্ত করেছেন নিজ ঘনিষ্ঠ মহলে। হটাৎই মন্দিরের ভবিষ্য নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন রানী রাসমণি। আত্মীয়-স্বজনের কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করতে লাগলেন, তার মৃত্যু হলে এই মন্দিরের ভবিষ্যৎ কি হবে তা নিয়ে।

চঞ্চল হয়ে উঠলেন রাসমণি। দিন কয়েক, তারপরই নির্দেশ দিলেন দিনাজপুরে (বর্তমান বাংলাদেশ) যে বিশাল জমিজমা তিনি কিনেছেন সব বিক্রি করে দিতে হবে। জমি বিক্রির মোটা অংকের টাকা চলে এলো হাতে। রাসমণি সিধান্ত নিলেন গড়ে তোলা হবে উপযুক্ত একটি ট্রাস্ট, যারা ভবিষ্যতে এই মন্দির পরিচালনা করবে। ১৮৬১ সাল শুরু হতে রানী অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ডাক্তার বদ্যি করেও লাভ হলো না।

শরীর দ্রুত খারাপ হতে শুরু করলো। তাড়া দিতে লাগলেন রানী। অবশেষে গঠিত হলো ট্রাস্ট। ১৮৬১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সেই ট্রাস্টের হাতে টাকা পয়সা এবং মন্দির পরিচালনার ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন রানী। এর পরদিন অর্থাৎ ১৮৬১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন বাংলার এই মহিয়সী নারী।

আরও পড়ুন