রানার ডেস্ক : ব্যাংকগুলি নিছক দাঁড়িয়ে আছে শিখন্ডির মতো, আর এগুলোকে সামনে রেখে রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট চালাচ্ছে ভারতের ধনী ব্যবসায়ীরা। রিজার্ভ ব্যাংক জানিয়েছে, ধনী ব্যক্তিরা ঋণের নাম করে সাম্প্রতিক সময়ে মোট সাড়ে তিন লক্ষ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে নিয়েছে। এই টাকা উদ্ধার করতে না পেরে ব্যাঙ্কের হিসেব থেকেই বাদ দিতে হয়েছে কর্তৃপক্ষকে। প্রায় হাজার খানেক ব্যক্তি ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছেন, তাদের আর সন্ধানও পাওয়া যাচ্ছে না।
৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে আর শোধ করেনি এমন ধনী ব্যক্তির সংখ্যা ৭১ জন। এই তথ্য দিল স্বয়ং রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া। লুটপাটের ভয়াবহতা বোঝাতে উদাহরণ হিসেবে তারা মাত্র একটি ব্যাঙ্কের হিসাব দিয়ে বোঝাতে চেয়েছে, পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। রিজার্ভ ব্যাংক জানিয়েছে, গত মার্চ মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার ঘর থেকেই ঋণের নাম করে ৭৬০০০ কোটি টাকা নিয়েছে ধনী ব্যবসায়ীরা।
এই টাকা উদ্ধার করতে না পেরে শেষপর্য্ন্ত এই টাকার হিসেব মুছে ফেলতে হয়েছে ব্যাঙ্কের খাতা থেকে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, মোট ২৫৩ জনের নিয়েছে এই ৭৬০০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২২০ জনের ঋণ ছিল ১০০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে, আর ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ ছিল ৩৭ জনের। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এই টাকা যারা আত্মসাৎ করলো তাদের একজনও কেউ সাধারণ ব্যক্তি নন, সকলেই ধনী ব্যবসায়ী এবং স্বাভাবিকভাবেই প্রভাবশালী ব্যক্তি।
অর্থাৎ শুধু মাত্র একটি ব্যাঙ্কের হিসাব থেকেই বোঝা যাচ্ছে, ভারতের অর্থনীতি কিভাবে পরিচালিত হয়। কিভাবে দেশের প্রভাবশালী অংশ লুট করে যাচ্ছে দেশকে। তথ্যের অধিকার আইন মোতাবেক একটি সংবাদপত্র রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে কিছু সুনির্দিস্ট তথ্য চেয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতেই উঠে এলো এই ভয়াবহ তথ্য। এই একটা তথ্য থেকেই উঠে এলো এদেশের ভয়াবহ দুর্নীতির একটুকরো ছবি।
যে ছবিটাই স্পষ্ট করে দেয় এই দুর্নীতির নেটওয়ার্ক কি মসৃনভাবে চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে, যেখানে দিনের আলোয় লুট হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ। সাম্প্রতিককালে বেশ কয়েকজন ধনী ব্যবসায়ী বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে চম্পট দিয়েছে। পরবর্তীকালে দেখা গেছে, এদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক যোগসূত্র অত্যন্ত জোরালো।
টাকা লুঠ হতে হতে ব্যাংকগুলি এখন ধুঁকছে। ক্রমাগত কমাতে হচ্ছে সঞ্চয়ে সুদের হার। ধাক্কা খাচ্ছে গরিব, নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ। রুগ্ণ হয়ে আসা ব্যাংকগুলিকে টিকিয়ে রাখতে কয়েকটি ব্যাংক মিশিয়ে একটা ব্যাংক তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। রাজনীতি থেকে শিল্পপতি সকলের নজর শুধু পাবলিকের পকেটের দিকে। পাবলিক যাতে এই সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাতে না পারে তার জন্য ওপর মহলে সবসময় পরিকল্পনা তৈরি হয়।
জনগণকে ব্যস্ত রাখো, উত্তেজিত করে রেখো, পারলে কোনও না কোনও ইস্যুতে আতঙ্কিত করে রাখো। তারপর নিজেদের কাজ চালিয়ে যাও নিপুণভাবে। খেয়াল করে দেখবেন, যখন পকেটমার কারো পকেট কাটে, তখন তারা সেই মানুষটিকে কোনও না কোনও ভাবে আতঙ্কিত, বিরক্ত বা উত্যক্ত করে তোলে।
গায়ে কিছু ফেলে দিল, কিংবা কয়েকজনের ধস্তাধস্তির মধ্যে তাকে ফেলে দেয়া হলো, তারপর যখন মানুষটি সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার দিকেই সব মনোযোগ স্থির করে, তখনই মাখনের মতো পকেট কেটে নেয় দুর্বৃত্তরা। এই একই ফর্মূলায় ধনী ব্যবসায়ী-রাজনীতিক আর দালালের চক্রব্যূহে আম জনতা আজ অভিমন্যু।
