২৩হাজার মৃত্যু ছুঁয়েছেন,আজ নিজেই হারিয়ে যাচ্ছেন মরদেহের মধ্যে

|

রানার প্রতিবেদন : সাম্প্ৰতিককালের সবচেয়ে আলোচিত কিছু দুৰ্ঘটনায় প্ৰাণ হারানো ব্যক্তিদের দেহের ময়নাতদন্ত করেছেন ফরেনসিক সার্জন ডা. রিচাৰ্ড শেফাৰ্ড ( Dr. Richard Shepherd )। তিনি কর্মজীবনের ৩৫ বছরে কমপক্ষে ২৩,০০০ ময়নাতদন্ত করেছেন। দীৰ্ঘদিন ধরে এই মৃতদেহ কাটাছেড়ার কাজ করার ফলে তাঁর মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা ধরনের মানসিক জটিলতা। তিনি নিজেই এখন গুরুতর অসুস্থ।

ফরেনসিক সার্জনের ( Forensic Surgeon ) পেশা মানসিক স্বাস্থ্যকে কতটা প্ৰভাবিত করেছে, এমন প্ৰেশ্নর উত্তরে ডা. শেফাৰ্ড বলেছেন, এক জায়গায় ২০০টি টুকরো টুকরো, ক্ষতবিক্ষত প্ৰাণহীন দেহ মানুষের মনে একটি ভয়াবহ ছাপ রেখে যায়। দৃশ্যটা যে রীতিমতো কুৎসিত ও ভীতিজনক তাতে সন্দেহ আছে কি? মৃত্যুর সঙ্গে তিনি খুবই পরিচিত, গত ৩৫ বছর ধরে রোজই মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর পরিচয়, কিন্তু এর মধ্যে এমন একটা সময় আসে, যখন এটিকে দৈনন্দিন জীবন থেকে পৃথক করা সম্ভব হয় না।

জানা গেছে, ১৯৮৭ সালে ইংল্যান্ডের ( England ) হাঙ্গারফোৰ্ড এলাকায় বন্দুকধারী মাইকেল রায়ান নিজেকে হত্যা করার আগে ১৬ জনকে গুলি করে হত্যা করে। ডা. শেফাৰ্ডের পেশাজীবনে প্ৰথম বড় কেস ছিল এটি। তাছাড়া ২০০২ সালে ইন্দোনেশিয়ার ( Indonesia ) বালি দ্বীপে বোমা হামলায় নিহতদের ময়নাতদন্তের দায়িত্বে ছিলেন এই চিকিৎসক। সে-সময় বরফ না থাকায় শবদেহগুলো শীতল রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে দেহগুলি গলেপচে কাদাকার হয়ে যায়।

সেই গলিত মৃতদেহগুলি তাঁকে ঘাটাঘাটি করতে হতো। তখন মানসিক সমস্যার সূত্ৰপাত হলেও ডাক্তার শেফাৰ্ড মনে করেন, এর গোড়াপত্তন হয় আরও বছর দশেক আগে। তিনি আরও বলেন, হাঙ্গারফোৰ্ড হত্যাকাণ্ডের পর মানসিক অস্থিরতার প্ৰথম ইঙ্গিত পান তিনি। এই ঘটনাটি খুবই উদ্ভট ও অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি তৈরি করেছিল তাঁর ভেতরে, যা পরবৰ্তী সময় ক্ৰমে বিস্তার লাভ করে।

শুধু তাই নয়, টুইন টাওয়ারে বোমা হামলায় নিহত থেকে শুরু করে ২০০৫-এর লন্ডন ( Landon ) হামলার শিকার কিংবা ১৯৯৩ সালে খুন হওয়া সাড়া জাগানো ফেন লরেন্স থেকে শুরু করে প্ৰিন্সেস ডায়ানার মৃতদেহের ময়নাতদন্তের দায়িত্বে ছিলেন এই চিকিৎসকই। সুতরাং দীৰ্ঘদিন এই পেশায় যুক্ত থাকার কারণে পোস্ট ট্ৰমাটিক ডিজঅৰ্ডারে (পিটিএসডি) ভুগতে হচ্ছে চিকিৎসক শেফাৰ্ডকে।

ফরেনসিক সার্জন হিসাবে সাফল্যের শীৰ্ষে থাকা অবস্থায় ৬০ বছর বয়সে তিনি এই সমস্যা তিনি নিজেই শণাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। ময়নাতদন্তের ক্ষেত্ৰে মূল কাজটিই হল সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করা। ডাক্তার শেফাৰ্ডের ভাবনায়, সত্য সবচেয়ে গুরুত্বপূৰ্ণ, তিনি এই নীতিতে বিশ্বাসী। তাই তিনি মৃতের পরিবারকে সবচেয়ে নিখুঁত তথ্য জানানোর চেষ্টা করেন।

মৃতের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নের সম্মুখীন তিনি হয়েছেন, তা হল, মৃত্যুর সময় কি মৃতব্যক্তি কোনও ধরনের ব্যথা অনুভব করেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে পরিবারের সদস্যরা যতই আঘাত পান না কেন, তিনি সাধারণত সত্যটাই বলে থাকেন। আর এটাই তাঁর পেশাগত নৈতিকতা। কেননা এই জাতীয় অপমৃত্যুতে সকলেই অসম্ভব ব্যথা পেয়েই মরেন।

এই চিকিৎসক তাঁর নতুন একটি বইয়ে লিখেছেন যে, একসময় চোখ বন্ধ করতেও তিনি ভয় পেতেন, কারণ তাঁর মনে হতো চোখ বন্ধ করলে রক্তাক্ত ওই অঙ্গ-প্ৰত্যঙ্গগুলি তাঁর চিন্তাকে গ্ৰাস করবে। তিনি বলেছেন, পরিপাকতন্ত্ৰ, স্পন্দনহীন হৃদপিণ্ড, ছিন্ন হাত, দম আটকানো রক্তের গন্ধ, পচা যকৃত প্ৰতিনিয়ত তাঁর শ্বাসপ্ৰশ্বাসে বাধা দিত। মাঝেমধ্যে তাঁর মনে হতো এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মনে হয় মৃত্যুই ভালো। তবে ময়নাতদন্ত যে কোনও নিৰ্দয় বিষয় নয়, তাও তিনি মনে করিয়ে দেন।

আরও পড়ুন