কাজের টেবিলে ক্লান্তি? কোরিয়ার সৃজনশীল ভাবনায় কুপোকাৎ বিশ্ব

|

রানার ডেস্ক : ইন্টেরিয়র ডিজাইন ( Interior Design )-এর কথা বহুদিন ধরেই শুনে এসেছি, এই শব্দটির সঙ্গে আমরা সকলেই কমবেশি পরিচিত। এবার এলো ডেস্কটিরিওর ডিজাইন ( Deskterior Design )। সত্যি বলতে কী, শব্দটির সঙ্গে আমরা একেবারেই পরিচিত নই। আসলে ব্যাপারটি হচ্ছে দীৰ্ঘসময় ধরে অফিসে বসে বসে কাজ করার ফলে চারপাশের একঘেয়েমি কাটাতে অফিসের ডেস্ক, কম্পিউটারের কি বোৰ্ড, বসার জায়গার চারপাশটা একটু নিজের মতো করে সাজিয়ে-গুছিয়ে নিয়ে বাড়ির লুক দেওয়াই ডেস্কটিরিওর ডিজাইন ( Deskterior Design )।

প্রথমে এই ভাবনাটি আসে দক্ষিণ কোরিয়া (South Korea) থেকে। এমনিতেই চিন, জাপান, কোরিয়ার মতো এশীয় দেশগুলিতে কাজের চাপ খুব বেশি। ২০১৮ সালে সেখানকার কেন্দ্ৰীয় সরকার সাপ্তাহিক কৰ্মঘণ্টা ৬৮ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৫২ ঘণ্টা করে। এত চাপ পড়ছিল যে বাধ্য হয়েই কৰ্মদক্ষতা বাড়ানোর জন্য কাজের সময় কমিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও অফিসের টাৰ্গেট, ডেডলাইন পূরণ করতে অনেক কর্মীই দীৰ্ঘক্ষণ বসে কাজ করেন।

আর সেজন্যই কাজ করতে করতে যাতে ক্লান্তি না আসে তাই নিজের ডেস্কটাকে একটু মনের মতো করে সাজিয়ে কিছুক্ষণের জন্য অন্যমনস্ক থাকার ভাবনাটা, মানে ডেস্কটেরিয়র ক্ৰমশই জনপ্ৰিয় হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার নামকরা একটি ব্যাংকের ব্যাংকার লি জু। তাঁর অফিসের ছোট্ট টেবিলটি দেখলে চট করে মনে হবে যেন একটুকরো পিংক ভিলা। সেখানে সবকিছুই গোলাপি রঙে সাজানো। এখানে আছে ছোট্ট পাখা, এয়ার পিউরিফায়ার, এমনকী কি বোৰ্ড, রাইটিং প্যাড, পেন সবকিছুই গোলাপি।

লি-এর ভাষায়, ‘আমার এই প্ৰতিষ্ঠানে প্ৰায় ছয় বছর হয়ে গেল কাজ করছি। আর একটা সময়ে কাজের একঘেয়েমি আমাকে এতটাই ঘিরে ধরেছিল যে ভাবলাম কী করব। তখনি ডেস্কটেরিয়রের ভাবনাটা মাথায় এল। তখন থেকেই টেবিল সাজানোর কাজ করে চলেছি। এর জন্য খরচ হয় প্ৰতি মাসে ২৫-৩৩ ডলার, কখনও-বা তার বেশি। তবে এই অৰ্থটা খুব বেশি নয়। এর ফলে মন ভালো হয় আর মানুষের কাজের উদ্যমও বাড়ে।’

সকলের ভাবনায় ব্যাংকারের চিরাচরিত টেবিল যেমন হওয়া উচিত, লি-এর টেবিল একেবারেই সেরকম নয়। আর এই কাজে শুধু লি একা নন, অনেকেই তাঁদের মনের মতো করে টেবিল সাজাচ্ছেন। লি বিষয়টিকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যা করেছেন, তাঁর মতে, ‘অফিস বলতে গেলে আমার দ্বিতীয় বাড়ি। ঘুম আর খাওয়ার সময়টুকু বাদ দিয়ে আমার একটা দীৰ্ঘসময় অফিসে কাটে। অনেকের কাছেই অফিস বড্ড বিরক্তিকর।

আনন্দ নেই, প্ৰতিদিনই এক কাজ। কিন্তু আমার মনে হয় ডেস্কটেরিয়র আমাকে এই ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে অনেকটাই সাহায্য করেছে। আমার কাছে গোলাপি রংটা খুবই প্ৰিয়। চারপাশে গোলাপি জিনিস থাকলে মন এমনিতেই আনন্দে ভরে ওঠে। উপরন্তু এটা আমাকে বাড়তি কৰ্ম উদ্যম জোগায়।’ আসলে ডেস্ক ( Desk ) ও ইন্টেরিয়র ( Interior ) শব্দদুটি যুক্ত হয়েই তৈরি হয়েছে ডেস্কটেরিয়র ( Deskterior ) শব্দটি, যার শুরু দক্ষিণ কোরিয়া থেকেই এবং সেখানকার সোশ্যাল নেটওয়াৰ্কিং (Social Networking ) সাইটে ক্ৰমশ জনপ্ৰিয় হয়ে উঠছে এই ভাবনাটি।

বিশেষ করে তরুণ সম্প্ৰদায়ের কাছে ইতিমধ্যেই এটা বিশাল জনপ্ৰিয়তা পেয়েছে। ৭৮৮ জন কৰ্মরত মহিলা ও পুরুষকে নিয়ে একটি সীমক্ষা করা হয়েছিল, যাতে দেখা গেছে ৪৪ শতাংশ মহিলা ও ২৯ শতাংশ পুরুষই ডেস্কটেরিয়রের পক্ষে। আর ৬৮ শতাংশ কোরীয় নাগরিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে টেবিল সাজাতে খুবই আগ্ৰহী। যেমন ব্র্যান্ড প্ৰোমোশনের পেশার সঙ্গে জড়িত রাহ হাই ইয়ং, তিনি জানান, ‘কাজের জায়গাটা আমি নিজের মনের মতো করে এমনভাবে সাজিয়ে নিয়েছি যে সবসময়ে মনে হয় বাড়িতে আছি।

আমার কাজ নতুন নতুন ব্ৰ্যাে`র প্ৰোমোশনাল ইভেন্টে কাজ করা। কাজেই আমাকে সৃজনশীল হতেই হবে। আর আমার মধ্যে ক্ৰিয়েটিভ ভাবনা থাকলে তবেই আমরা তা ক্ৰেতাদের মধ্যে পৌঁছে দিতে পারব।’ ডেস্কটেরিয়র কোরিয়ায় এত জনপ্ৰিয় হচ্ছে যে তার জন্য তৈরি হয়েছে আলাদা একটা বাজার। সেখানে তারছাড়া কি বোৰ্ড, ল্যাপটপ, রঙিন ডেস্কের মতো পণ্য, এমনকী অফিসের চেয়ারে বসার কুশন বা ছোট গাছের ধারণা খুব দ্ৰুতই জনপ্ৰিয় হেচ্ছ।

সাংসিন উইমেন্স, ইউনিভাৰ্সিটির আৰ্কিটেকচার বিভাগের অধ্যাপক লি হ্যাং ইউন জানান, ‘কাজের পরিবেশের বেশ কয়েকটি পরিবৰ্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। কৰ্মজীবনের ভারসাম্য গুরুত্বপূৰ্ণ সামাজিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। একঘেয়ে দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে নিজস্ব জগৎ তৈরির ভাবনা থেকেই ডেস্কটেরিয়রের ভাবনাটি এতটা জনপ্ৰিয় হচ্ছে।’

আরও পড়ুন