রানার প্রতিবেদন : ইয়াস সাইক্লোনে বিধস্ত পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশাসহ ভারতের পূর্ব উপকূল। প্ৰকৃতির কাছে মানুষ কত অসহায় সে কথা মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে। ‘প্ৰাকৃতিক বিপৰ্যয়’ এই বিশেষণে এখন কিন্তু নেহাতই একটা আত্মপ্ৰবঞ্চনা, একটা দায় এড়ানো ভাব প্ৰচ্ছন্ন থাকে। যাঁরা অজ্ঞ নন বা সচেতন বা ওয়াকিবহাল, তাঁরা কিন্তু জানেন প্ৰাকৃতিক বিপৰ্যয়ের অনেকটাই আজ আর প্ৰাকৃতিক কিংবা ন্যাচারাল নয়।
মানুষের প্ৰকৃতিবিরোধী নানা কৰ্মকাণ্ড এর জন্য দায়ী। যে গ্লোবাল ওয়াৰ্মিং বা বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে সারা বিশ্ব উদ্বিগ্ন তা তো মানুষের কাণ্ডজ্ঞানহীন কৰ্মকাণ্ডের কারণেই। সাম্প্রতিক গবেষণা জানাচ্ছে আমফান-ইয়াসের মতো বিভিন্ন বিধ্বংসী ঝড়ের সংখ্যা ও প্ৰাবল্য বৃদ্ধির পিছনে বিশ্ব উষ্ণায়ন তথা মানুষের হাত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে।
জীবজগতে মানুষই একমাত্ৰ জীব যার বিরামহীন অগ্ৰগতি ও ভোগপিপাসার হাত ধরে অবলা জীবজগৎ ও পরিবেশের ওপর ক্ৰমবৰ্ধমান দূষণ ছেয়ে যাচ্ছে। এই অবলাদের নিৰ্বাক করুণ ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য মানুষের কাছে বহুদিন আগে থেকেই আবেদন জানিয়ে বলা হয়েছিল: ‘সাউণ্ড ফর দ্য সাউণ্ড অব দ্য সাউণ্ডলেস’। জীবজগতে মানুষ ও মনুষ্যেতর প্ৰাণীর মধ্যে মানুষই দূষণের ব্যাপারে সৰ্বাংশে দায়ী।
তেমনই মনুষ্যজাতির ভিতরেও রয়েছে দূষণ-বৈষম্য। মনুষ্যজাতির ধনী সম্প্ৰদায় দ্বারা সৃষ্ট দূষণের অসহায় ভাগীদার হচ্ছে গরিবগুরবো সম্প্ৰদায়। গরিবগুরবোদের দ্বারা ছড়ানো দূষণ অপেক্ষাকৃত অনেক কম। দূষণের এ এক বিচিত্ৰ দিক। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্ৰেক্ষাপটে এই দিকটা ভাবা খুব জরুরি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যে বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে এত কথা তার মূলে রয়েছে গ্ৰিন হাউস প্ৰভাব।
গ্ৰিন হাউস গ্যাসসমূহের (যাদের একসঙ্গে জি এইচ জি বলে) মধ্যে আছে কাৰ্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, ক্লোরোফ্লুরোকাৰ্বন, ওজোন, নাইট্ৰাস অক্সাইড, জলীয় বাষ্প ইত্যাদি। এদের মধ্যে প্ৰথম তিনটি কাৰ্বন-ঘটিত গ্যাসের প্ৰভাব যথাক্ৰমে ৫০, ১৯ এবং ১৬ শতাংশ। অৰ্থাৎ গ্ৰিনহাউস প্ৰভাবের ৮৫ শতাংশই কাৰ্বন-ঘটিত। তাই বিশ্ব উষ্ণায়নের আলোচনায় কাৰ্বন-নিঃসরণ একটা সূচক নিৰ্ধারক।
দেখা গেছে যে দেশ যত বেশি ধনী মাথাপিছু কাৰ্বন-নিঃসরণও তত বেশি। যেমন মাৰ্কিন যুক্তরাষ্ট্ৰ, কানাডা, রাশিয়া, জাৰ্মানি, ব্ৰিটেন, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়নে বছরে মাথা পিছু গড় কাৰ্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ যথাক্ৰমে ২৫, ২৩, ১৩, ১২, ১১, ১১, ১১ টন। ভারত, বাংলাদেশ, আফগানিস্তানের ক্ষেত্ৰে তা যথাক্ৰমে ২, ১ ও ০.৫ টন। অৰ্থাৎ বাংলাদেশের তুলনায় ভারতীয়রা দ্বিগুণ এবং ভারতীয়দের তুলনায় মাৰ্কিনরা ১২ গুণের বেশি মাথাপিছু কাৰ্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ করে।
দেশে দেশে এই বৈষম্যের মতো একই দেশের বিভিন্ন আৰ্থিক অবস্থাপন্ন মানুষদের মধ্যেও মাথাপিছু কাৰ্বন-নিঃসরণের বৈষম্য লক্ষ করা যায়। উদাহরণ হিসাবে আমাদের দেশের কথাই ধরা যাক। কয়লা, তেল, বিদ্যুৎ ইত্যাদি ব্যবহারের ক্ষেত্ৰে শহরের সৰ্বোচ্চ ব্যক্তিটির সঙ্গে গ্ৰামের সৰ্বনিম্ন ব্যক্তিটির অনুপাতকে ‘চূড়ান্ত বৈষম্য অনুপাত’ (ই ডি আর) আখ্যা দিয়ে ১৯৯৭ সালে মুম্বাইয়ের ইন্দিরা গান্ধী ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট রিসাৰ্চের একদল গবেষক দেখেন কয়লা, তেল ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্ৰে এই ‘ই ডি আর’ যথাক্ৰমে ১০.৩, ১৪.৮ এবং ৯।
অৰ্থাৎ শহরের সৰ্বোচ্চ ওই ব্যক্তিটি গ্ৰামের সৰ্বনিম্ন অবস্থানে থাকা ব্যক্তিটির অপেক্ষা বছরে গড়ে ১২ গুণ কাৰ্বন দূষণ ছড়াচ্ছে। সারা ভারতের বিভিন্ন শহর ও গ্ৰামে চালানো সমীক্ষার ভিত্তিতে গ্ৰিন পিস এক রিপোৰ্ট প্ৰকাশ করে। তাতে বিভিন্ন আয়ের মানুষদের বিভিন্ন খাতে কাৰ্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের বৈষম্য বিকটভাবে ধরা পড়েছে। যেমন মাসিক আয় তিন হাজার টাকা বা তার নীচে এমন মানুষ বিদ্যুৎ, রান্নাবান্না ও পরিবহণ খাতে বছরে মাথাপিছু গড়ে ৩৩৫ কেজি কাৰ্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ করে।
মাসিক আয় ৩০ হাজার টাকা বা তার বেশি মানুষের ক্ষেত্ৰে তখন তা ১,৪৯৫ কেজি। গড় ভারতীয়ের ক্ষেত্ৰে সেটা ৫০১ কেজি। অৰ্থাৎ ধনীদের বিপুল কাৰ্বন-পাপের বোঝা বইতে হচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষজনকে। পলিউটার পেস অৰ্থাৎ দূষণকারীকেই শোধ করতে হবে, এরকম একটা প্ৰবাদ চালু আছে। এ শোধ টাকার বিনিময়ে হয় না, দূষণ নিঃসরণ নিয়ন্ত্ৰণের মধ্য দিয়ে সেই শোধবোধ প্ৰকাশ করতে হয়।
কিয়েতো প্ৰোটোকলেও তো বলা হয়েছিল তথাকথিত উন্নত দেশগুলি ২০১২ সালের মধ্যে তাদের কাৰ্বন-নিঃসরণ ১৯৯০-এর তুলনায় ৫.২ শতাংশ কমিয়ে আনবে। মানুষের ভোগলিপ্সা এতই প্ৰকট যে চুক্তিবদ্ধতার দায়ভার কখন যে কাগজের নৌকার মতো ভেসে চলে যায় টেরই পাওয়া যায় না।
কিন্তু ইয়াসের মতো বিধ্বংসী সাইক্লোন যখন নিৰ্মমভাবে জানান দিয়ে যায়, তখন কিছুদিনের জন্য সংবিৎ ফিরে আসে।আলোচনা-পৰ্যালোচনা, দূষণ পরিবেশ, সাসটেনেবিলিটি, ভবিষ্যৎ প্ৰজন্ম ইত্যাদি নিয়ে কথার ফুলঝুরি ছলে।কুম্ভীরাশ্ৰুপাত হয়।কিন্তু প্রাণ ও বসত হারায় গরিবরাই।
