রানার প্রতিবেদন : গত এক বছর ধরে করোনা ভাইরাস যে স্টিম রোলার চালাচ্ছে তা সকলেই দেখতে পাচ্ছি। আক্ৰান্ত ও মৃত ব্যক্তিদের সংখ্যা যে ক্ৰমশই বেড়ে চলেছে সেই খবর এখন জলভাত। এর মধ্যেই সমগ্ৰ বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছে আফ্ৰিকার দ্বীপরাষ্ট্ৰ মাদাগাস্কার থেকে আসা একটি বিশেষ খবর।
আর তা হল সেদেশের স্থানীয় একটি উদ্ভিদ থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে নাকি এমন পানীয় তৈরি করা হচ্ছে যা করোনা ভাইরাস প্ৰতিরোধে সক্ষম। আর সবচেয়ে বড় কথা মাদাগাস্কারের প্ৰেসিডেন্ট ইয়ান্দ্রি এন্ড্রি রাজোইলিনা নিজে আৰ্টেমিসিয়া নামক ওই গাছের আশ্চৰ্য গুণের বৈশিষ্ট্য সংবাদমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেছেন।
ওই গাছটি নিয়ে গবেষণা করতে করতে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক চমকপ্ৰদ তথ্য। আৰ্টেমিসিয়া নাম্নী ওই গাছ থেকে যে নির্যাস পাওয়া যায় তা ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় ভীষণভাবে কাৰ্যকর।
তবে করোনার বিষয়টি মেনে নিতে পারছে না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। তাদের মতে, এই গাছ যে কোভিড ১৯-এর বিরুদ্ধে প্ৰতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম, সেই বিষয়ে সুনিৰ্দিষ্ট করে কোনও প্ৰমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তবে গবেষকরা এটা নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেছেন, আর এর মধ্যেই এমন কিছু উপাদান সত্যিই পাওয়া গেছে যা করোনার বিরুদ্ধে প্ৰতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম।
এই গাছটি বৰ্তমানে মাদাগাস্কারে থাকলেও এর আদি উৎস এশিয়া। যেসব দেশে প্ৰচুর রোদ পাওয়া যায় সেই দেশে এই গাছ থাকে। চিনের সনাতনী ওষুধ তৈরিতে আৰ্টেমিসিয়ার রস ব্যবহৃত হয়ে আসছে বিগত দুহাজার বছর ধরে। মূলত ম্যালেরিয়া বা জ্বর সারাতে বা ব্যথা-বেদনার উপশমে আৰ্টেমিসিয়া খুব ভালো কাজ করে।
প্ৰাচীন চিনের ভেষজশাস্ত্ৰে একে বলা হতো কিংহাও। এর ইংরেজি নাম সুইট ওয়াৰ্মউড বা অ্যানুয়াল ওয়াৰ্মউড। এমনকী বিকল্প উপাদান হিসাবে কিছু কিছু মদ তৈরিতেও এর ব্যবহার আছে। মাদাগাস্কারের প্ৰেসিডেন্ট এন্ড্রি রাজোইলিনা জানান, আৰ্টেমিসিয়া থেকে তৈরি কোভিড অগ্যানিক্স নামের একটি পানীয়ের উপর সমীক্ষা চালানো হয়েছে এবং তা রোগের চিকিৎসায় কাৰ্যকর হবে বলে জানা গেছে।
তবে ঠিক কী কী উপাদান দিয়ে এই পানীয়টি তৈরি সেই বিষয়ে এখনও বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি। তবে সরকারপক্ষের বক্তব্য, কোভিডের ওষুধ এই পানীয়টির ৬০ শতাংশই এসেছে আৰ্টেমিসিয়া গাছ থেকে। এমনকী আরও কয়েককদম এগিয়ে মাদাগাস্কারে এর নির্যাস নিয়ে ক্যাপসুল ও ইঞ্জেকশন তৈরি হয়েছে এবং মানবদেহের উপর তার ক্লিনিক্যাল ট্ৰায়ালও শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই।
জার্মান এবং ড্যানিশ বিজ্ঞানীরাও বৰ্তমানে আৰ্টেমিসিয়া অ্যানুয়া গাছের নির্যাস নিয়ে নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন। পরীক্ষার সময়ে গবেষণাগারে করোনার বিরুদ্ধে এর কিছু কাৰ্যকারিতা দেখা গেছে। গবেষণা বলছে এই নির্যাসকে যখন ইথানল বা বিশুদ্ধ জলের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়, তখন তা অ্যান্টি ভাইরাল হিসাবে কাজ করে।
তবে এই গবেষণাকে অন্য বিজ্ঞানীদের এখনও যাচাই করে দেখার অবকাশ হয়নি। বৰ্তমানে মাৰ্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। চিনেও আৰ্টেমিসিয়া নিয়ে যেসব ওষুধ তৈরি করা হয়েছে তা পরীক্ষা করে দেখা হয়। আৰ্টেমিসিয়া উদ্ভিদটির একাধিক প্ৰজাতি বৰ্তমান।
এর মধ্যে আৰ্টেমিসিয়া অ্যানুয়া এবং আৰ্টেমিসিয়া আফ্ৰা নামের দুটি প্ৰজাতি কোভিড ১৯-এর বিরুদ্ধে লড়তে সক্ষম কি না, তা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়েছে দক্ষিণ আফ্ৰিকাতেও। তবে এর ফল কী হয়েছে তা সাধারণকে জানানো হয়নি। হু-ও জানিয়েছে মাদাগাস্কারের পরীক্ষা সম্পৰ্কে এখনও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংস্থাটির আফ্ৰিকান অঞ্চলের পক্ষ থেকে জঁ ব্যাপটিস্ট নিকিয়েমা জানান, প্ৰথম ট্ৰায়ালগুলিতে ফলাফল দেখার পরেই হয়তো পরবতী পযায়ের ট্ৰয়ালের সঙ্গে তারা জড়িত হবেন। তবে এ বিষয়ে হু একটি জরুরি তথ্য দিয়েছে, গাছ থেকে ওষুধ তৈরি হলে সমস্ত উদ্ভিদেরই কাৰ্যকারিতা ও পাৰ্শ্বপ্ৰতিক্ৰিয়াকে বিশ্লেষণ করে নেওয়া প্ৰয়োজন।
চিনে ১৮৭০-এর দশকে যখন ম্যালেরিয়া মহামারি রূপে দেখা দেয়, তখন সেখানকার বিজ্ঞানীরা এটি আবিষ্কার করেন। আৰ্টেমিসিনভিত্তিক কম্বিনেশন, থেরাপি যাকে বলা হয় এসিটি, তা ম্যালেরিয়া সারাতে যে ব্যবহার করা যাবে তার অনুমোদন দিয়েছে হু।
বিশেষ করে ম্যালেরিয়ার ক্ষেত্ৰে যেখানে ক্লোরোকু্ইন রেজিসটান্স হয়ে গেছে সেক্ষেত্ৰে এটি খুবই উপকারী। এসিটি-তে আৰ্টেমিসিনজাত উপাদান ছাড়াও অন্য আরও কিছু পদাৰ্থ থাকে, যা মানবদেহে ম্যালেরিয়া প্যারাসাইটের সংখ্যা কমাতে পারে।
