Mukul Roy : গতকাল সকাল থেকে সমস্ত খবর দখল করে নিয়েছিলেন মুকুল রায় ( Mukul Roy )। জল্পনা সত্যি করে দুপুরের পর যোগ দিলেন তৃনমূলে ( Trinamool Congress- TMC )। এসব দৃশ্য বাংলার মানুষকে অবশ্যই ঝাকুনি দিয়েছে যথেষ্ট। যে মানুষটার রাজনৈতিক উত্থান হয়েছিল মমতার হাত ধরে, তৃণমূলে তিনিই ছিলেন সেকেন্ড ইন কমান্ড। কিন্তু জেলের ভয় পেয়েছিলেন মুকুল। সারদা কাণ্ডে ( Saradha Chit Fund ) তাঁকে গ্রেফতার করে জেলে পুরে দেবে এই আতঙ্কে ঘোষণা করেই তৃনমূল ছেড়ে দেন তিনি।
পরে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিড়ে যান গেরুয়া শিবিরে। তার নতুন দলে যাত্রা স্থায়ী হলো মাত্র তিন বছর আট মাস। আবার ফিরে গেলেন পুরনো ঘরে। কেন? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে গভীর জটিল গহ্বরে। প্রথম কারন, মুকুল সম্পর্কে সাধারণের মধ্যে প্রচলিত ধারনায় প্রভাবিত হয়েছিলেন কৈলাশ বিজয়বর্গীয় ( Kailash Vijayvargiya )। মুকুল একজন চাণক্য, তার হাতের মুঠোয় আছে তৃনমূল দলটা।
তিনি চাইলেই তৃনমূল ভেঙে চুরমার করে দিতে পারেন এবং তার রণকৌশল অনুযায়ী দল এগিয়ে যাবে সাফল্যের শিখরে। অচিরেই ভুল ভাঙলো বিজেপি ( BJP ) নেতাদের। তারা দেখলেন, তৃনমূল দলে একজনের কথাই শেষ কথা তিনি মমতা ব্যানার্জি ( Mamata Banerjee )। মুকুল দু’একজন বিক্ষুব্ধকে গেরুয়া ছাতার নিচে আনতে পারলেও দলে আঁচড়টুকু কাটতে পারেননি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলেন, যিনি সত্যি উঁচু মাপের নেতা হবার ক্ষমতা রাখেন, যিনি তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ধরেন, তিনি কোনও দিনই মমতা ব্যানার্জির সুনজরে থাকেননি।
তাদের নানাভাবে দলে কোণঠাসা হয়েই থাকতে হয়েছে। যেমন অজিত পাজা, পঙ্কজ ব্যানার্জি, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় কিংবা সৌগত রায়ের রাজনৈতিক জীবন দেখলেই তা স্পষ্ট। যার নিজস্ব ক্ষমতা সীমিত, যিনি ইয়েস বস হয়ে থাকতেই চান, তিনি একমাত্র থাকতে পারেন তৃনমূল নেত্রীর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মধ্যে এবং দলে যার উত্থানও হয় মসৃনভাবে। মুকুল রায় দলের সংগঠনের দায়িত্ব হাতে পেয়েছিলেন দল ক্ষমতায় আসার পর, শাসক দলের হয়ে সংগঠন বিস্তার কোনও কঠিন কম্ম নয় বলেই মত পর্যবেক্ষকদের।
তাদের দাবি, মুকুলকে তৃনমূল নেত্রী কাঁধের ওপর বসিয়ে রেখেছিলেন বলেই তার উচ্চতা এত বেশি দেখাতো। মমতার কাঁধ থেকে নেমে আসতেই মুকুলের আসল উচ্চতা সামনে চলে আসে। লোকসভায় মোদির ক্যারিশমা, পুলওয়ামা হত্যাকান্ড, ভারত-পাক সংঘর্ষের আবহ, পাকিস্তানের কাছ থেকে গ্রেফতার পাইলট অভিনন্দন বর্তমানকে ছিনিয়ে আনা, সব মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যার ঢেউয়ে চেপে নজিরবিহীন সাফল্য পায় বিজেপি।
যে ঢেউ আছড়ে পড়েছিল এরাজ্যেও। পশ্চিমবঙ্গের সাফল্যের জন্য মুকুলের কোনও অবদান ছিল বলে মনে করেননি দিল্লির নেতারা। ফলে মুকুল থেকে যান উপেক্ষার আড়ালে। কোনও পদ ছাড়াই সাধারণ সদস্য হয়ে। এসময়ই মুকুল আবার তৃণমূলের দিকে পা বারবার ইঙ্গিত দিতে শুরু করেন। ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেন কৈলাশ, তার অনুরোধেই মুকুলকে দলের কেন্দ্রীয় পদ দিয়ে সেই যাত্রা নিরস্ত্র করা হয়।
কৈলাসের বিশ্বাস ছিল, মুকুলকে দিয়ে কাজ হবে। কিন্তু দিল্লির মনে হয়, মুকুল সেই আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে আসরে নামছেন না। দ্বিতীয়ত সারদা মামলা সামনে এনে তৃণমূলকে কোণঠাসা করার পরিকল্পনা নিয়ে মুকুলকে কার্যত উপেক্ষা করছিল বিজেপি। দিল্লি চেয়েছিল সারদা মামলার জালে তৃণমূলকে টেনে আনলে প্রতিপক্ষকে অনেকটাই গুঁড়িয়ে দেয়া যাবে। কিন্তু মুকুলকে দলে কেন্দ্রীয় পদ দেবার পর, সারদা-নারদা দুটো মামলাই কার্যত ফাইলবন্দী হয়ে পড়ে।
কারন দুটো মামলাতেই জড়িয়ে মুকুল রায়ের নাম। মুকুলকে বড় পদে এনে তাকে নেতার মর্যাদা দেয়া হলেও মুকুল কিন্তু সেই উৎসাহ নিয়ে লড়াইয়ে তীব্রতা আনতে পারেননি। এমনকি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, নদিয়ায় তিনি ভোটে লড়লেন কিন্তু জেলার অন্য কোনও প্রার্থীর হয়ে প্রচারে তাকে দেখা গেল না। এমনকি নিজের কেন্দ্রেও তাঁকে তেমনভাবে প্রচারে দেখা যায়নি। ওই কেন্দ্রটিতে যেহেতু বিজেপির একচ্ছত্র আধিপত্য আছে, তাই জিততে অসুবিধা হয়নি।
অন্যদিকে তৃনমূল নেত্রীর চোখে চোখ রেখে তীব্র লড়াই দিয়েছেন শুভেন্দু। সংঘাতের তুঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন নন্দীগ্রামকে। ফলে দুটো পাশাপাশি রেখে তুলনা হয়েছে দলে। ভোট শেষ হতেই বিরোধী দল নেতার দায়িত্ব দেওয়া হয় শুভেন্দুকে। সিনিয়র নেতা মুকুলকে উপেক্ষা করে হালে দলে আসা শুভেন্দুর হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়। বার্তা পৌঁছে যায় মুকুলের কাছে। ভোট শেষ হতেই রাজ্যজুড়ে তৈরি হয় সন্ত্রাসের পরিবেশ।
বিজেপি কর্মী খুনের ঘটনা, ধর্ষণ, এমনকি বাড়ি ছাড়া হতে হয় অনেককে। এই অভিযোগে সরব হয় বিজেপি। এরপরই ঘটে নারদ কান্ডে চারজনের গ্রেফতার। দলের একাংশ চায় সারদা কাণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ুক কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা, কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ান মুকুল। দলের কেন্দ্রীয় নেতা জড়িয়ে পড়লে দলের ভাবমূর্তি ঘা লাগবে বলেই সারদার ফাইলে ধুলোর আস্তরণ পুরু হতে থাকে। দলকে বাঁচাতে, দলীয় কর্মীদের ওপর আক্রমণে রাশ টানতে পাল্টা ব্যবস্থা নেবার ক্ষেত্রে এই মুকুল নামক এই প্রতিবন্দকতাকে আবার উপেক্ষার আড়ালে ঠেলে দেওয়া হয়।
মুকুল বুঝতে পারেন গেরুয়া শিবিরে চিরকাল তাকে বহিরাগত হিসাবেই থাকতে হবে। আবার তিনি যোগাযোগ করেন তৃণমূলের সঙ্গে। বিজেপির অন্দরে খবর , শুভেন্দুকে মাথায় তুলে নাচানাচি শুরু হতেই মুকুল তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছিলেন, এবং সেই অনুযায়ী পা ফেলতে শুরু করেছিলেন। যার প্রতিফলন হয়েছে মমতার গলায়,” ভোটের সময় মুকুল তৃণমূলের বিরুদ্ধে কোনও কথাই বলেনি।” ভোটের প্রচারে একদিন মমতা এও বলেছিলেন, মুকুলকে কোণঠাসা করে রেখেছে বিজেপি। ওকে প্রার্থী করা উচিত ছিল বাড়ির আশেপাশে, তা না করে পাঠানো হয়েছে কৃষ্ণনগরে।
মুকুল বিজেপি ছেড়ে তৃনমূলে আসতেই অভিষেক মনু সিংভির টুইট, “বিজেপি এখন সারদা নিয়ে কি করবে, সেটা দেখাই মজার বিষয় হয়ে উঠবে।” তৃনমূল ইঙ্গিত দিয়েছে, সারদার ফাইল খুললে তারা উটলে সেটার রাজনৈতিক লাভ তোলার চেষ্টা করবেন প্রতিহিংসার তত্ত্ব খাড়া করে।
