লকডাউনে বিশ্বজুড়ে বেড়েছে নারী নির্যাতন, দৈনিক খুন হচ্ছে ১৪০ জন মহিলা

|

রানার প্রতিবেদন : পৃথিবীব্যাপী নারী নির্যাতন যে ভয়ংকরভাবে বেড়ে গেছে, তা অতি বড় নারীবিদ্বেষীও বিনা দ্বিধায় মেনে নেবেন। কন্যাভ্ৰূণ হত্যা থেকে এর শুরু হয়, তারপর একটু বড় হলে কন্যাসন্তান জন্মানোর জন্য তাকে হত্যা করা, যৌননিগ্ৰহ, বধূনিগ্রহ এবং অবশেষে তাকে খুন, সব মিলিয়ে ক্ৰমশ বিশ্বজুড়ে বাড়ছে মহিলাদের হত্যার ঘটনাও। সম্প্ৰতি রাষ্ট্ৰপুঞ্জের ( United Nations ) একটি গবেষণা এই বিষয়ে এমন একটি পরিসংখ্যান প্ৰকাশ করেছে যা দেখলে অবাক হওয়া ছাড়া আর কোনও গত্যন্তর থাকে না।

বিশ্বজুড়ে প্ৰতিদিন গড়ে প্ৰায় ১৩৭-১৪০ জন মহিলা খুন হচ্ছেন। এবং তাঁদের মারছে হয় পুরুষসঙ্গী নয়তো পরিবারের সদস্যদের হাতে তাঁরা খুন হচ্ছেন। রাষ্ট্ৰপুঞ্জের ড্ৰাগ ও অপরাধ-সংক্ৰান্ত দপ্তর তাদের এক গবেষণায় এই ভয়ংকর প্ৰতিবেদন তুলে ধরেছে। তাদের মতে, এই পরিসংখ্যান আরও একটি ভয়ংকর তথ্যের দিকে আঙুল তুলছে এবং তা হল মহিলারা বাড়িতে থাকলেও যে সুরক্ষিত থাকবেন, সে-বিষয়েও কোনও নিশ্চয়তা নেই।

এই সমীক্ষা জানাচ্ছে ২০১৭ সালে সারা পৃথিবী জুড়ে মোট ৮৭ হাজার মহিলা নিহত হয়েছেন। আরও দুঃখজনক হল তাঁদের অৰ্ধেকেরও বেশি মারা গেছেন বাড়ির লোক কিংবা ঘনিষ্ঠজনদের হাতেই। আরও একটি সমীক্ষা স্পষ্টভাবে বিষয়টি জানিয়েছে প্ৰায় ৩০ হাজার মহিলা খুন হয়েছেন খুব কাছের সঙ্গীর জন্য আর বাকি কুড়ি হাজারের মৃত্যুর জন্য দায়ী কোনও না কোনও আত্মীয়।

ইউনাইটেড নেশনসের দেওয়া তথ্যকে অনুসরণ করে আরও বলা যায় যে ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডের হিসাবে পুরুষদের খুন হওয়ার হার মহিলাদের তুলনায় চারগুণ কম। তাদের মতে, সারা বিশ্বে যত মহিলা মারা যান, তাঁদের মধ্যে আটজনই পুরুষসঙ্গীর হাতে। কিন্তু কেন এভাবে নিৰ্বিচারে মহিলা হত্যা বাড়ছে? এ-প্ৰসঙ্গে রীতিমতো চিন্তিত সমাজবিদ থেকে শুরু করে চিকিৎসকমহল, মনোবিদ সকলেই।

এর উত্তরে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ( Boston University ) একটি গবেষণাপত্ৰে বলা হয়েছে, এখনকার মহিলাদের খুন হওয়ার পিছনে অন্যতম প্ৰধান কারণ পারিবারিক হিংসা। বিয়েতে পাত্ৰপক্ষ পণ না পেলে, পরে পাত্ৰপক্ষর দাবিমেটাতে না পারলে, কিংবা কন্যাসন্তান জন্মদানের অপরাধে স্ত্ৰীকে মেরে ফেলার ঘটনা অহরহ বাড়ছে আর এর পিছনে রয়েছে মানুষের অজ্ঞতা আর অশিক্ষা, সঙ্গে কুসংস্কার। পাশাপাশি সম্পত্তির লোভের মতো বিষয়টিকেও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

আবার আরেক দল এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন মহিলাদের জীবনধারা ও বদলে যাওয়া সমাজের চিত্ৰকে। পাশ্চাত্যদেশের মতো এখন এ-দেশেও লিভ ইন বাড়ছে আর পরকীয়া তো বৈধই। এই লিভ ইনের ফলে যখন সঙ্গীদের ছাড়াছাড়ি হচ্ছে বা কোনও কারণে মতের মিল হচ্ছে না, তখন পুরুষসঙ্গী মহিলাসঙ্গীটিকে খুন করতেও দুবার ভাবছেন না। খোদ রাষ্ট্ৰপুঞ্জের রিপোৰ্টও সে-কথা বলেছে, ঘনিষ্ঠ পাৰ্টনারের হিংসর কারণে প্ৰচুর মহিলাকে প্ৰাণ হারাতে হচ্ছে।

তাছাড়া মানুষের মধ্যে বিকৃত মানসিকতা ক্ৰমশ বেড়ে যাওয়ায় যৌন নিগ্ৰহ বা ধৰ্ষণের পরেও খুনের সংখ্যা বাড়ছে। আপাতত সরকারি সূত্ৰে যেসব তথ্য পাওয়া গিয়েছে তার উপর নিৰ্ভর করেই রাষ্ট্ৰপুঞ্জ ওই প্ৰতিবেদনটি তৈরি করেছে, এবার ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর থেকে সারা বিশ্বে যত মহিলা নিহত হয়েছেন, তা নিয়ে তাঁরা বিশ্লেষণ করবেন। মহিলা মানে পূৰ্ণবয়স্কা মহিলাদের উপরই যে শুধু নিযাতন বাড়ছে এমন নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরের, বিভিন্ন বয়সের বালিকা, কিশোরী, যুবতী নানাভাবে অপমানিত, লাঞ্ছিত, শারীরিক নিযাতনের শিকার হচ্ছেন।

সম্প্ৰতি এই বিষয়ে প্ৰকাশিত আরেকটি রিপোৰ্টে ভয়ংকর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে–তাতে বলা হয়েছে সারা বিশ্বে যত মহিলা আছেন তাঁদের মধ্যে গড়ে তিনজনের মধ্যে একজন হিংসার শিকার। এই হিংসা বলতে একদিকে পারিবারিক হিংসা, সামাজিক অপমান, যৌনহিংসা সবকিছুকেই বোঝানো হয়েছে। পরিসংখ্যানটি রীতিমতো উদ্বেগজনক। আর এই সংখ্যাটা বেড়ে গেছে গত বছর থেকে চলে আসা লকডাউনে।

কেননা লকডাউনে অনেক মহিলাকেই সেইসব পুরুষের সঙ্গে বাধ্য হয়ে থাকতে হয়েছে যারা তাঁদের উপর নির্যাতন করে বা করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ( World Health Organization ) তৈরি একটি প্ৰতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। মহিলাদের প্ৰতি হওয়া এ অন্যায় প্ৰতিরোধে সম্মিলিত রাষ্ট্ৰপুঞ্জের স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থাটি বিভিন্ন দেশকে আরও বেশি সচেতন হতে ও মহিলাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলেছে। এই হিংসার কারণ হিসাবে একাধিক তথ্যকে তুলে ধরা হয়েছে।

তার মধ্যে পুরুষতান্ত্ৰিক সমাজকাঠামো, সামজে আৰ্থিকভাবে মহিলাদের স্বাবলম্বী না হওয়া কিংবা পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের আয় সেই অনুপাতে না হওয়া, কন্যাভ্ৰূণ হত্যা, বাল্যবিবাহ, পুরুষদের বিকৃত যৌন মানসিকতা ইত্যাদি কারণকে তুলে ধরা হয়েছে। তাই মহিলাদের সঙ্গে পুরুষদের আৰ্থিক বৈষম্যের ব্যাপারটিও যাতে কমিয়ে আনা যায় সেই বিষয়েও নজর দিতে বলা হয়েছে বিভিন্ন দেশকে।

হু ( WHO )-এর প্ৰতিবেদনে আরও বলা হয়েছে অনেক মহিলা শুধু আৰ্থিকভাবে স্বাবলম্বী না হওয়ার কারণে অত্যাচারিত হয়ে পুরুষবা ওই পরিবারের থেকে বেরিয়ে এসে নিজে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে না। সেজন্য যেসব দেশে নারীশিক্ষার হার এখনও কম, সেখানে বিষয়টিকে গুরুত্বর সঙ্গে দেখে সকল মেয়েই যাতে নিৰ্দিষ্ট স্তর পৰ্যন্ত পড়াশোনা করতে পারে সেই বিষয়ে নজরদারি করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্ৰকের আছে আবেদন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন