এই পথ এখন শেষ, প্রকাশ্যে আসছে দিলীপ-লকেট দ্বন্দ্ব

|

রানার প্রতিবেদন : ক্ষমতার প্রশ্নে চাপা সংঘাত সামনে আসতে শুরু করলো এবার। একটা সময় ছিল যখন দলে নবাগতা লকেট ( Locket Chatterjee ), সভাপতির পদে দায়িত্বে এলেন দিলীপ ঘোষ ( Dilip Ghosh )। নতুন রাজ্য সভাপতির সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে সচেতন ছিলেন লকেট। দিলীপ ঘোষ রাজ্য সভাপতি হবার কিছুদিন আগেই তৎকালীন রাজ্য সভাপতি রাহুল সিংহের হাত থেকে পতাকা নিয়ে গেরুয়া শিবিরে নাম লিখিয়েছিলেন লকেট।

টালিগঞ্জে অভিনয়ের সুবাদে নিজস্ব পরিচয় ছিল তাঁর। যার জোরেই একসময় ঘনিষ্ট হয়েছিলেন তৃনমূল শিবিরের। মহিলা ও শিশু কল্যাণ কমিশনে সদস্যও করা হয়েছিল তাকে। তারপর কোনও এক অজানা কারণে তৃনমূল ছেড়ে আচমকাই বিজেপিতে ভিড়ে যান তিনি। অজানা কারন নিয়ে নানাবিধ চর্চা থাকলেও এটা বাস্তব, লকেট যখন বিজেপিতে এলেন তখন গেরুয়া শিবিরের এই রমরমা ছিল না।

সাফল্যের দূর সম্ভাবনা থাকলেও সেইসময় দলের জীর্ণ কাঠামোই ছিল সম্বল। পরিস্থিতি সম্পুর্ন ঘুরতে শুরু করে গত লোকসভা নির্বাচনের পর। হুগলি থেকে নির্বাচিত হন লকেট চ্যাটার্জি। বীরভূমে ভোটে হারার পর, ভবিষ্যৎ সাফল্য নিশ্চিত করতে বীরভূমেই মন দিয়ে রাজনৈতিক চাষবাস করছিলেন লকেট। অল্প দিনের মধ্যেই তার বুদ্ধিমত্তা, দলীয় কাজে নিষ্ঠা, লাগাতার আন্দোলনমুখী কর্মসূচি এবং সকলকে নিয়ে নিয়ে চলার সংস্কৃতি তাকে অচিরেই আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে চলে আসে।

মহিলা শাখার সভানেত্রী হয়ে, কার্যত অখ্যাত এই শাখা সংগঠনটিকে পাদ প্রদীপের নিচে নিয়ে আসেন লকেট। কিন্তু সাংসদ হওয়া এবং দিল্লি যাত্রা লকেটের দৌড়কে আরো তীব্র করে তোলে। রাজ্যের গন্ডি কেটে সেলুলয়েডের এক সময়ের নায়িকা পাড়ি জমান দিল্লি। অচিরেই সদর দফতরে পরিচিতি গড়ে ওঠে তার। দিল্লি নেতৃত্বের একাংশ লকেটকে এগিয়ে দেবার চেষ্টা করেন রাজ্য রাজনীতিতে।

বিজেপি জিতলে কে হবেন মুখ্যমন্ত্রী এই প্রশ্নের দৌড়ে ধীরেলয়ে শামিল হয়ে যান লকেট চ্যাটার্জিও। এই দৌড় শুরু হতেই দিলীপের সঙ্গে এক অঘোষিত, অদৃশ্য ছায়াযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন তিনি। একসময় প্রকাশ্যে চলে আসে সেই দ্বন্দ্ব। সমস্ত জেলায় দলীয় সভাপতির পদগুলিতে নিজেদের পছন্দের লোক বসাতে শুরু করেন দিলীপ ঘোষ। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় আসানসোল এবং হুগলিকে ঘিরে।

বাবুল এবং লকেট কিছুতেই দিলীপ ঘোষের পছন্দের লোককে মেনে নিতে রাজি হননি। দু’জনই চেয়েছিলেন নিজেদের কেন্দ্রের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দিলীপ ঘোষের হাতে না ছেড়ে নিজেদের হাতে রেখে দিতে। বাবুল প্রথম দিন থেকেই দিল্লি নেতৃত্বের কাছের লোক। এদিকে লোকসভা ভোটের পর দিল্লিতে পরিচিতি তৈরির চেষ্টায় কোনও ত্রুটি রাখেননি লকেট। দুজনই দিলীপ ঘোষের সঙ্গে জেলা সভাপতি নিয়ে দ্বন্দ্বে শামিল হয়ে যান।

লকেট দিল্লির খুঁটির জোরে শেষপর্যন্ত দিলীপের প্রার্থীকে আটকে নিজের পছন্দের লোককে চেয়ারে রাখতে সক্ষম হন। কিন্তু হুগলি জেলা সভাপতি সুবীর নাগ শেষপর্য্ন্ত বিধানসভায় টিকিট না পেয়ে সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দেন। নতুন যিনি দায়িত্ব পান সেই গৌতম চাটার্জিও নাকি খাস লকেটের লোক। এবারও রাজ্য সভাপতির লোককে আটকে দিলেন তিনি। শুক্রবার দিলীপ ঘোষ চুচুরা গিয়েছিলেন হুগলি জেলার সাংগঠনিক বৈঠকে যোগ দিতে।

সেই বৈঠক চলাকালীন জনা কুড়ি বিজেপি কর্মী দলীয় কার্যালয়ে এসে জেলা সভাপতি সহ জেলা নেতৃত্বের একাংশের অপসারণ চেয়ে তাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। দিলীপ ঘোষের সঙ্গে দেখা করে তারা বক্তব্য জানানোর চেষ্টা করলে তাদের আটকে দেওয়া হয়। বৈঠক শেষ করে দিলীপ বাইরে আসতেই বিক্ষুব্ধরা চিৎকার চ্যাচামেচি করে তাকে ঘিরে ধরেন।

আরও পড়ুন : Scientific Innovation : ক্ষেত থেকে শুধু শস্যই নয়, পেতে পারেন বিদ্যুৎও

প্রথমে দিলীপ ঘোষ ভেবেছিলেন সার্বিকভাবে দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানাতে এসেছেন এরা। ফলে শুরুতেই রেগে যান দিলীপ। বকাঝকাও শুরু করেন তিনি। একটু পরেই বুঝতে পারেন এদের যাবতীয় রাগ জেলা সভাপতির ওপর। তৎক্ষণাৎ মেজাজ পাল্টে যায় দিলীপের। ঠান্ডা মাথায় এক বর্ষীয়ান বিক্ষোভকারীকে তিনি বলেন, এভাবে হবে না, আপনি সিনিয়র লোক কয়েকজনকে নিয়ে আমার কাছে আসুন, সবটা শুনতে চাই।

তাদের সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষাতের স্থান-দিন-সময়ও জানিয়ে দেন রাজ্য সভাপতি। এই ঘটনা কানে যেতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন লকেট। তার অভিযোগ, পেছন থেকে একটা অদৃশ্য শক্তি লাগাতার কলকাঠি নেড়ে যাচ্ছে। তারাই এই সব তথাকথিত বিক্ষুব্দদের পাঠিয়েছে বিক্ষোভ দেখতে। এদের প্রত্যেককে শোকজ করা হবে বলে ঘোষণা করে দেন লকেট।

আরও পড়ুন : আলাদিনের উড়ন্ত গালিচা আর কল্পনা নয়, বাস্তব করলেন বিজ্ঞানীরা

অর্থাৎ রাজ্য সভাপতি যাদের বৈঠকের জন্য সাদরে ডেকে নিলেন তাদের শোকজের হুমকি দিলেন লকেট। বুঝিয়ে দিলেন বর্তমান জেলা সভাপতির পাশে তিনি আছেন এবং তার বিরুদ্ধে যে কোনও ধরনের তৎপরাত রুখতে তিনি পিছপা হবেন না। বিক্ষোভকারীদের হুমকি দিয়ে আসলে রাজ্য সভাপতিকেই প্রচ্ছন্ন বার্তা দিয়ে রাখলেন লকেট চ্যাটার্জি।

আরও পড়ুন