রানার ডেস্ক : নরেন্দ্র মোদি হাওয়ায় ভেলা ভাসিয়ে বঙ্গ বিজেপি প্রথম চমক দিয়েছিল ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে। সেই থেকেই আশার প্রদীপ জ্বালানোর কাজ শুরু। সেবার বিজেপির ঝুলিতে জমা পড়েছিল ১৭.০২ শতাংশ ভোট। যে দল এরাজ্যে ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে অভ্যস্ত, সেই দল কিনা ১৭ শতাংশের বেশি ভোট পাচ্ছে? এটা সম্ভব হয়েছিল, গোটা দেশে মোদি হাওয়ার জেরে।
যে হওয়া এসে লেগেছিল এরাজ্যেও। দুটি আসন পেলেও বঙ্গ রাজনীতিতে তারপর থেকেই রীতিমতো ছাপ ফেলতে শুরু করে গেরুয়া শিবির। এই প্রথম বাংলায় ক্ষমতার গন্ধ পেতে শুরু করে মোদি ক্যাম্প। পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে আসেন উত্তরপ্রদেশের বিজেপি নেতা সিদ্ধার্থ নাথ সিং। তার হাতে প্রচুর ক্ষমতা দিয়েই পাঠানো হয় কলকাতা, নজরে ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচন।
কিন্তু কংগ্রেস এবং বামেরা সেবার হাত মিলিয়ে মমতা বিরোধী হাওয়া তৈরি করতে পারায়, ভোট যুদ্ধে সেবার অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে বিজেপি। ঝুলিতে আসে মাত্র তিনটে আসন। বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়া হয় সিদ্ধার্থ নাথ সিংয়ের। ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে তাকে প্রার্থী করা হয়। বর্তমানে সিদ্ধার্থ নাথ সিং উত্তরপ্রদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রী।
তাকে বিদায় করে দিয়ে নিয়ে আসা হয় কৈলাশ বিজয় বর্গীয়কে। মধ্যপ্রদেশের এই নেতা দলের কেন্দ্রীয় সম্পাদক। কৈলাসের হাতে কার্যত তুলে দেওয়া হয় বঙ্গ বিজেপির দায়িত্ব। পরে একে একে সহকারী পর্যবেক্ষক হিসাবে এসেছেন আরও দুজন, শিবপ্রকাশ এবং অরবিন্দ মেনন। কার্যত কৈলাসের চাপাচাপিতেই নারদা-সারদায় অভিযুক্ত মুকুলকে দলে নিতে সবুজ সংকেত দেয় দিল্লি।
লোকসভা ভোটে দল আশাতীত ফল করলেও মুখ থুবড়ে পড়েছে বিধানসভা ভোটে। পর্যবেক্ষকদের দাবি, ১৯ শের সাফল্যের জন্য কৈলাশ কিংবা দিলীপের কৃতিত্ব দেখলে মস্ত ভুল হবে। ১৯ শে দেশ জুড়ে ভোট হয়েছে, পুলওয়ামা-সার্জিক্যাল স্ট্রাইক-বৈমানিক অভিমুন্যর মুক্তি-দেশজোড়া মোদির ভাবমূর্তি। ২০২১ ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে মোদি নয় যুদ্ধটা ছিল মমতার বিরুদ্ধে।
মুখ্যমন্ত্রী পদের এই যুদ্ধে মমতার বিপরীতে কাউকে পেশ করতে পারেনি বিজেপি। কৈলাসের নেতৃত্বে তৃণমূলকে দুর্বল করার যে অভিযান নেওয়া হয়েছিল তাতে সব দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বিজেপি। প্রথমত এভাবে প্রতিদিন উৎসব করে তৃনমূল ভাঙানো এবং দ্বিতীয়ত তৃণমূলের মধ্যে যারা জনপ্রিয়তা হারিয়েছে, বা যাদের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ তারাই দলে দলে এসে বিজেপিতে ভিড় করেছেন।
মানুষ এদের ভালোভাবে নেয়নি। একারনে দলবদলুদের সিংহভাগই ভোটে ধরাশায়ী হয়েছেন। এছাড়া পাইকারি হারে সিনেমার লোককে ভোটে নামিয়ে জোর ধাক্কা খেয়েছে বিজেপি। বাঙালির মানসিকতা বুঝতে না পারা, বাংলার নারির স্পন্দন টের না পাওয়া, ভিন দেশি নেতারা গোবলয়ের ধাঁচে রাজনীতি করতে গিয়েই দলকে ডুবিয়েছেন। বিজেপির অন্দরে পুরনো কর্মীরা বারবার এই কথাই বলছেন।
দিল্লি চাইছে, সব পেছনে ফেলে ২০২৪ এর জন্য কোমর বাঁধতে। ফলে কৈলাশকে সরিয়ে এখন উপযুক্ত মুখের খোঁজ করছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। কলকাতার নেতারা বুঝিয়েছেন, এমন কাউকে পাঠান, যিনি বাংলা ও বাঙালি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। এই প্রসঙ্গেই উঠে এসেছে স্মৃতি ইরানির নাম। পরিষ্কার বাংলায় কথা বলাই শুধু নয়, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং জাতীয় স্তরের সেলিব্রেটি বাঙালির সঙ্গে একাত্ম হতে পারবেন সহজেই শুধু ভাষার হাত ধরে। কেউ তাঁকে বহিরাগত বলতে চাইলে উল্টে ক্ষতি হবে তাদের।
এর আগে বঙ্গের পর্যবেক্ষক ছিলেন স্মৃতি। রাজ্যটাকে যে কোনো কেন্দ্রীয় নেতার থেকে বেশি ভালো চেনেন। সুতরাং স্মৃতিকেই চাই আওয়াজ উঠতে শুরু করেছে বিজেপির অন্দরে। রাজ্য নেত্রত্ব বলেন, স্মৃতির মস্ত গুন হলো, সকলকে নিয়ে চলতে পারেন, যেটা কৈলাশের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অভাব ছিল। রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষকে এড়িয়ে দলের অন্দরে নিজস্ব বলয় তৈরি করেছিলেন কৈলাশ, যে বলয়ের প্রধান মুখ ছিলেন মুকুল। এই মুখের সঙ্গে দিলীপের কি সম্পর্ক , তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
